উপন্যাস ও বই

পদ্মজা-পর্ব ৪৫

পদ্মজা-পর্ব ৪৫

ট্রেনের বগি দিয়ে হেঁটে সামনে এগোচ্ছে আমির। তার এক হাতে লাগেজ অন্য হাতে পদ্মজার হাত। শক্ত করে ধরে রেখেছে যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে। পদ্মজার মুখ নিকাবের আড়ালে ঢেকে রাখা। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমিরকে প্রশ্ন করল, ‘খালি সিট রেখে আমরা কোথায় যাচ্ছি?’


‘কেবিনে।’


ততক্ষণে দুজন ৭৬ নম্বর কেবিনের সামনে চলে এসেছে। আমির দরজা ঠেলে পদ্মজাকে নিয়ে ঢুকল। চারটা বার্থ। চারজনের কেবিন বোঝাই যাচ্ছে। পদ্মজা বলল, ‘বাকি দুজন কখন আসবে? ট্রেন তো ছেড়ে দিচ্ছে।’


‘চার বার্থই আমাদের।’


পদ্মজা ডান পাশের বার্থে বসতে বসতে বলল, ‘অনেক খরচ করেছেন।’


আমির লাগেজ জায়গা মতো রেখে পদ্মজার পাশে বসল। বলল, ‘নিকাব খোলো এবার। কেউ আসছে না।’


পদ্মজা নিকাব খুলল। ঝমঝম শব্দ তুলে ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে। আমির জানালা খুলে দিতেই পদ্মজার চুল তিরতির করে উড়তে থাকল। পদ্মজা দ্রুত দুই হাত মুখের সামনে ধরে, বাতাস থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। আমির বাঁ-পাশের বার্থে বসে হাসল। বলল, ‘হাত সরাও। বউকে একটু দেখি।’


পদ্মজা দুই হাত সরাল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি। চোখ ছোটো ছোটো করে তাকিয়ে আছে। চুল অবাধ্য হয়ে উড়ছে। আমির এক হাতের উপর থুতনির ভর দিয়ে বলল, ‘এই হাসির জন্য দুনিয়া এফোঁড়ওফোঁড় করতে রাজি।’


পদ্মজা দাঁত বের করে হাসল, লজ্জায় নামিয়ে নিলো চোখ। আমির পদ্মজার পাশে বসে খোঁপা করে দিল। বলল, ‘এবার বোরকাটাও খুলে ফেল! গরম লাগছে না?’


পদ্মজা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। আমির বলল, ‘কেউ আসবে না। পৌঁছাতে বিকেল হবে। নিশ্চিন্তে শুধু বোরকা খুলতে পারো। আর কিছু খুলতে হবে না।’


পদ্মজার কান রি রি করে উঠে। আমিরের উরুতে কিল দিয়ে বলল, ‘ছি, আপনি যা তা!’


আমির উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। পদ্মজা ভ্রুকুটি করে বোরকা খুলে জানালার ধারে বসে বলল, ‘আমরা যে বাড়িতে যাচ্ছি সেখানে কে কে থাকে?’


‘একজন দারোয়ান আর একজন বুয়া আছে।


‘উনারা বিশ্বস্ত?’


‘নয়তো রেখে এসেছি?’


পদ্মজা কিছু বলল না। আমির পদ্মজার পাশ ঘেঁষে বসল। পদ্মজার কানের দুলে টোকা দিয়ে জড়িয়ে ধরল কোমর। পদ্মজা মেরুদণ্ড সোজা করে বসে। শীতল একটা অনুভূতি সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। চোখ বুজে স্বভাববশত বলে উঠে, ‘কেউ দেখবে!’


আমির ভ্রুকুঞ্চন করে চোখ তুলে তাকাল। পদ্মজা বুঝতে পারে, সে ভুল শব্দ উচ্চারণ করে ফেলেছে। জিহ্বা কামড়ে আড়চোখে আমিরকে দেখে হাসার চেষ্টা করল। আমির বেশ অনেকক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল পদ্মজার দিকে।


এরপর আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, পদ্মজার ঘাড়ে নাক ডুবিয়ে বলল, ‘দেখুক। যার ইচ্ছে দেখুক।’


.


দরজায় টোকা দিচ্ছে কেউ। শব্দে পদ্মজার ঘুম ছুটে গেল। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল সে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, মনে পড়ছে না। আমিরের কোলে তার মাথা ছিল। মানুষটা এতক্ষণ বসে ছিল তাহলে? পদ্মজাকে এভাবে উঠতে দেখে আমির ইশারায় শান্ত হতে বলে। পদ্মজা দ্রুত নিকাব পরে নেয়। আমির গিয়ে দরজা খুলল। ঝালমুড়ি নিয়ে একজন লম্বা লোক দাঁড়িয়ে আছে, নাকটা মুখের তুলনায় একটু বেশি লম্বা। আমির বলল, ‘এভাবে অনুমতি না নিয়ে টোকা দেয়া অভদ্রতা। আমাদের দরকার পরলে আপনাদের এমনিতেই খুঁজে নিতাম। আর এমন করবেন না। আপনার জন্য আমার বউয়ের ঘুম ভেঙে গেছে। নিন টাকা। ঝালমুড়ি দেন।’


লোকটি বেশ আনন্দ নিয়ে ঝালমুড়ি বানিয়ে দিল। বোধহয় আর বিক্রি হয়নি। হতে পারে আমিরই প্রথম খরিদ্দার। লোকটি চলে গেল। আমির কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে পদ্মজাকে বলল, ‘একজন লোক ঝালমুড়ি বিক্রি করতে এসেছিল। এই নাও খাও। এরপর আবার ঘুমাও।’


দুজনে একসঙ্গে ঝালমুড়ি খেতে খেতে সুখ-দুঃখের গল্প শুরু করে। আমির তার শহুরে জীবনের গতিবিধি বলছে: কখন কখন বাসায় থাকে, কীভাবে ব্যবসায় সময় দেয়। পদ্মজা মন দিয়ে শুনছে। একসময় পদ্মজা বলল, ‘একটা কথা জানার ছিল।’


‘কী কথা?’


‘আমার মনে হচ্ছে, আপনাদের বাড়িতে লুকোনো কোনো ব্যাপার আছে। শুধু মনে হচ্ছে না, একদম নিশ্চিত আমি।’


আমির উৎসুক হয়ে ঝুঁকে বসল। আগ্রহভরে জানতে চাইল, ‘কীরকম?’


পদ্মজা আরো এগিয়ে আসে। আকাশে দুপুরের কড়া রোদ। ছলাৎ করে রোদের ঝিলিক জানালায় গলে কেবিনে ঢুকে আবার হারিয়ে যাচ্ছে। বাতাস ভ্যাপসা গরম, মাঝে মাঝে শীতল, ঠান্ডাও। সেসব উপেক্ষা করে পদ্মজা তার ভেতরের সন্দেহগুলো বলতে শুরু করল, ‘আমি নিশ্চিত, রুম্পা ভাবিকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। কেন বন্দি করে রাখা হয়েছে সেটা দাদু জানেন। উনি সবসময় রুম্পা ভাবির ঘরের দরজায় নজর রাখেন। আমি অনেকবার ঢুকতে চেয়েছি, পারিনি। বাড়ির পেছনের জঙ্গলে কিছু একটা আছে। সেটা ভূত- জিন জাতীয় কিছু না, অন্যকিছু। এমনটা মনে হওয়ার তেমন কারণ নেই। আমার অকারণেই মনে হয়েছে, জঙ্গলটা আপনাআপনি সৃষ্টি হয়নি আর ভয়ংকরও হয়নি। কেউ বা কারা এই জঙ্গলটিকে যত্ন করে তৈরি করেছে। ভয়ংকর করে সাজিয়েছে। এছাড়া, বাড়ির সবাইকে আমার সন্দেহ হয়। এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন?’


আমির একটুও অবাক হলো না, মুখের প্রকাশভঙ্গী পালটাল না। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আমি জানি এসব।’


পদ্মজা আমিরের দুই হাত খামচে ধরে এক নিশ্বাসে বলল, ‘আমাকে বলুন। অনুরোধ লাগে, বলুন। আমি শুনতে চাই। অনেকদিন ধরে নিজের ভেতর পুষে রেখেছি।’


আমির অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল। বলল, ‘আমার ধারণাও তোমার ধারণা অবধিই সীমাবদ্ধ। এর বাইরে কিছু জানি না। এই রহস্য খুঁজে বের করার ইচ্ছে হওয়া সত্ত্বেও আমি হজম করেছি। আমার ইচ্ছে মাটিচাপা দিয়েছি।’


আমিরের গলাটা কেমন যেন শোনাল। পদ্মজা কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, ‘কেন? কেন দিয়েছেন?’


আমির হাসল। বলল, ‘ধুর! এখন এসব গল্প করার সময়? শুনো, এরপর কী করব…


পদ্মজা কথার মাঝে আটকে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘কথা ঘোরাবেন না। আমি খেয়াল করেছি হাওলাদার বাড়ির প্রতি আপনি উদাসীন। কোনো ব্যাপার পাত্তা দেন না। সবসময় বাড়ির চেয়ে দূরে দূরে থাকেন। কোনো ঘটনায় নিজেকে জড়ান না। কেন নিজেকে গুটিয়ে রাখেন?’


আমিরের দৃষ্টি অস্থির। সে এক হাতে বার্থ খামচে ধরার চেষ্টা করে ঘন ঘন শ্বাস নেয়। পদ্মজা খুব অবাক হয়! আমিরের এত কষ্ট হচ্ছে কেন?


পদ্মজার উৎকণ্ঠা, ‘কী হলো আপনার? কোথায় কষ্ট হচ্ছে?’


‘না! কিছু হয়নি।’ বলেই আবার অদ্ভুতভাবে ডাকল, ‘পদ্মবতী?’


আমির চট করে পদ্মজার দুই হাত শক্ত করে ধরল। তার চোখ দুটিতে ভয়। পদ্মজা আমিরের চোখের দিকে তাকাল। আমির বলল, ‘আমার তোমাকে অনেক কিছু বলার আছে। অনেকবার বলতে গিয়েও পারিনি। আজ যখন কথা উঠেছে…আচ্ছা পদ্মজা, আমার পরিচয় জেনে আমাকে ছেড়ে যাবে না তো? আমি তোমাকে হারালে একাকীত্বে ধুঁকে ধুঁকে নিঃশেষ হয়ে যাব। আমার জীবনের একমাত্র সুখের আলো তুমি।’


পদ্মজার হৃৎপিণ্ড থমকে গেল। সে পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারছে না। আমির উত্তরের আশায় চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে। পদ্মজা ধীর কণ্ঠে বলল, ‘লুকোনো সব কথা বলুন আমাকে। আপনি আমার স্বামী। আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা কখনো ভাবি না আমি। বিশ্বাস করুন!’


আমির নতজানু হয়ে বলল, ‘আমি আমার আব্বার অবৈধ সন্তান। আমার জন্মদাত্রী জন্ম দিয়েই মারা যায়। দিয়ে যায় অভিশপ্ত জীবন।’


পদ্মজা দুই পা কেঁপে উঠে। মাথা ভনভন করে উঠে। শিরদাঁড়া বেয়ে গড়িয়ে যায় ঠান্ডা স্রোত। আমির ঢোক গিলে আবার বলল, ‘আমার জন্মদাত্রী মারা যাওয়ার পর আব্বা আমাকে নিয়ে আসেন। আমার বর্তমান আম্মা আমাকে দেখে খুব রেগে যায়। কিছুতেই আমাকে মানতে চায়নি। তখন ছেলেমেয়ে ছিল না আম্মার। তাই মাস ঘুরাতেই আমাকে মেনে নিলো। ছেলের মতো আদর শুরু করল। এসব দাদুর মুখে পরে শুনেছি। আব্বা আমাকে তুলে এনে জায়গা দিলেও সন্তানের মতো ভালোবাসেননি কখনো। যখন আমার এগারো বছর আমি আর রিদওয়ান একসঙ্গে জানতে পারি, আমি আব্বার অবৈধ সন্তান। আব্বা আবার রিদওয়ানকে খুব আদর করতেন। রিদওয়ান ছোটো থেকেই আমার সঙ্গে ঝামেলা করত, ঝগড়া করত। যখন এমন একটা নোংরা খবর জানতে পারল, তখন ও আরো হিংস্র হয়ে ওঠে। আমি তখন অনেক শুকনো আর রোগা ছিলাম। রিদওয়ান ছিল স্বাস্থ্যবান, তেজি। আব্বার এমন ছেলেই পছন্দ। কেন পছন্দ জানা নেই। উনিশ থেকে বিশ হলেই রিদওয়ান খুব মারত। আব্বার কাছে বিচার দিলে রিদওয়ান আরো দশটা বানিয়ে বলত। তখন আব্বা আমাকে মারতেন।


‘রিদওয়ান একবার আমাকে জঙ্গলে বেঁধে ফেলে রেখেছিল। দেড় দিন পড়ে ছিলাম। রাতে ভয়ে প্যান্টে প্রস্রাব করে দিয়েছি। মুখ বাঁধা ছিল, তাই এত চিত্কার করেছি তবুও কেউ শুনেনি। ভয়ে বুক কাঁপছিল। মনের ভয়ের কারণে কল্পনায় ভয়ংকর ভূত, দানব দেখছিলাম। বাঁচানোর মতো কেউ ছিল না। আমাদের বাড়িতে কাজ করতেন ফকির মিয়া নামে একজন। দেড় দিনের দিন উনি আমাকে জঙ্গলে বাঁধা অবস্থায় পান। বাড়িতে বৈঠক বসে। রিদওয়ানকে দুটো বেতের বাড়ি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। রিদওয়ান এক তো বলিষ্ঠবান তার উপর আমার দুই বছরের বড়ো। কিছুতেই পেরে উঠতাম না। জানো পদ্মবতী, ও…ও পানিতে আমার মাথা জোর করে চেপে ধরে রেখেছে অনেকবার। ও মানসিকভাবে বিকৃত, পশু। ওর জন্য আমার জীবন জাহান্নাম হয়ে ওঠে। আম্মাকে বললেও আম্মা বাঁচাতে পারতেন না। সবসময় নিশ্চুপ থাকতেন। যখন আমার পনেরো বছর বয়স, তখন এক শীতের রাতে পালানোর চেষ্টা করি; শীতে কাঁপতে কাঁপতে খেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। পরেরদিন চোখ খুলে দেখি, আমি হাওলাদার বাড়িতে। আমার সামনে রিদওয়ান, আব্বা, চাচা, আম্মা সবাই। বুঝতে পারি, আমার আর কোনো জায়গা নেই। এখানেই থাকতে হবে। যতই কষ্ট হোক থাকতে হবে। এছাড়া উপায় নেই।’


আমিরের কণ্ঠে স্পষ্ট কান্না। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। পদ্মজা হেঁচকি তুলে কাঁদছে। আমির অশ্রুসজল চোখ মেলে পদ্মজার দিকে তাকাল। হেসে পদ্মজার দুই চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, ‘আরে পাগলি! কাঁদছো কেন? এসব তো পুরনো কথা। আমার পড়াশোনাটা আবার চলছিল ভালোই। আমি ভালো ছাত্র ছিলাম। এ দিক দিয়ে বুদ্ধিমান ছিলাম। সবসময় ভালো ফলাফল ছিল। এজন্য কদর একটু হলেও পেতাম। যখন আমার আঠারো বয়স বাড়িতে অস্বাভাবিক কিছু অনুভব করি। রাত করে অদ্ভুত কিছুর শব্দ শুনি। জঙ্গলে আলো দেখতে পাই। চাচাকে প্রায় রাতে জঙ্গলে যেতে দেখি। রিদওয়ান আর চাচা মিলে কিছু একটা নিয়ে সবসময় আলাপ করত। ওদের চোখেমুখে থাকত লুকোচুরি খেলা। আমি একদিন রাতে চাচাকে অনুসরণ করি। প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর চাচা দেখে ফেলে। এই ভুলের জন্য সেদিন কম মার খেতে হয়নি! তবুও বেহায়ার মতো কয়দিন পর আবার অনুসরণ করি। রিদওয়ান পেছনে ছিল দেখিনি।


‘আব্বা সেদিন অনেক মারলেন। দা পর্যন্ত ছুঁড়ে মারেন। এই যে থুতনির দাগটা, এটা সেই দায়ের আঘাত। একসময় আব্বা আমাকে নিয়ে আলোচনায় বসলেন। বললেন, আমাকে পড়ালেখার জন্য শহরে পাঠাবেন কোনো ব্যাবসা করতে চাইলে তারও সুযোগ করে দিবেন। আমি এই বাড়ি আর বাড়ির আশপাশ নিয়ে মাথা না ঘামাই। আমি মেনে নিই। রিদওয়ানের সঙ্গে থাকতে হবে না আর। এর চেয়ে আনন্দের কী আছে?


চলে আসি ঢাকা। শুরু হয় নিজের জায়গা শক্ত করার যুদ্ধ। এখানে এসেও অনেক অপমান সহ্য করতে হয়। তবুও থেমে যাইনি। যুদ্ধ করে চলেছি। আমাকে বাঁচতে হবে। মানুষের মতো বাঁচতে হবে। কারো লাথি খেয়ে না। যখন আমার তেইশ বছর, তখন থেকে আমার কদর বেড়ে যায়। ব্যবসায় মোটামুটি সফল হয়ে যাই। ভাগ্য ভালো ছিল আমার। অতিরিক্ত পরিশ্রম আমাকে নিরাশ করেনি। তখন আব্বা আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ রিদওয়ান আগের মতো হাত তোলার সাহস পায় না। সেই আমি আজ এই জায়গায়। এখন আমার যে অবস্থান, হাওলাদার বাড়ির কারোর সাহস নেই আমার চোখের দিকে তাকানোর। আমি চাইলেই শোধ নিতে পারি। কিন্তু নেব না। তারা থাকুক তাদের মতো। রিদওয়ান ছোটোবেলা যা করেছে, মেনে নিয়েছি। এখন তোমার দিকেও নজর দিয়েছে। ওর নজর আমার বাড়িগাড়ি, অফিস-গোডাউনেও আছে। আমি টের পাই, ও পারলে আমাকে খুন করে ফেলত। কিন্তু পারে না। আমার ক্ষমতার ধারেকাছেও ওর জায়গা নেই। এখন আমার নিজের এক বিশাল রাজত্ব আছে, আছে অহংকার করার মতো অনেক কিছু। হাওলাদার বাড়ির কেউ কেউ মিলে আমাকে নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করছে, আমি নিশ্চিত। তাই বাড়িতে আমি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। আম্মা ছাড়া ওই বাড়ির সবার ভালোবাসা মুখোশ মাত্র। আমার দরকার ছিল একজন ভালো মনের সঙ্গিনী। আমি পেয়ে গেছি, আর কিছু দরকার নেই। আমি আমার অর্ধাঙ্গিনীকে তার আসল সংসারে নিয়ে যাচ্ছি। এখন আমার মন শান্ত। কোনো চিন্তা নেই। নিজেকে খুব বেশি সুখী মনে হচ্ছে।’


আমির পদ্মজার হাতে চুমু খেল। পদ্মজা তখনো কাঁদছে। সে আচমকা আমিরকে গভীরভাবে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভেজা কণ্ঠে বলল, ‘আমি কখনো আপনাকে কষ্ট দেব না। কোনোদিন না। কেউ আপনাকে ছুঁতে আসলে আমি তার গর্দান নেব। আমি উন্মাদ হয়ে তাকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করব।’


‘এখন আর কারো সেই ক্ষমতা নেই। মিছেমিছি ভয় পাচ্ছো।’


পদ্মজা আরো শক্ত করে তাকে ধরার চেষ্টা করে। আমির পদ্মজার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, ‘এই প্রথম আমার বউয়ের গভীর আলিঙ্গন পেলাম। ভালো লাগছে। ছেড়ো না কিন্তু!’


.


রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে হাঁটছে ওরা। আমির পদ্মজার এক হাত ধরে রেখে খুব দ্রুত হাঁটছে। পদ্মজা তাল মেলাতে পারছে না, চেষ্টা করছে যদিও। মোটরগাড়ি নিয়ে একজন কালো চশমা পরা লোক অপেক্ষা করছিল। তার সামনে থামল আমির। লোকটা সালাম দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে ব্যাগ জায়গামতো রাখল। আমির আগে উঠতে বলল পদ্মজাকে। পদ্মজা অবাক হলো। এরকম গাড়ির সঙ্গে সরাসরি পরিচয় নেই তার। কিন্তু প্রকাশ করল না। আমিরের কথামতো গাড়িতে উঠে বসল সে, তারপর উঠল আমির গাড়ি চলতে শুরু করে। আমির পদ্মজাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমাদের নিজস্ব গাড়ি। দুজনে রাত-বিরাতে যখন-তখন ঘুরতে বের হব।’


পদ্মজা কিছু বলল না। সে উপভোগ করছে নতুন জীবন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে গাড়ি একটা বাড়ির সামনে থামল। কালো চশমা পরা লোকটি দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে খুলে দিল আমিরের ডান পাশের দরজা। পদ্মজাকে নিয়ে নামল আমির।


বাড়ি দেখে তো পদ্মজা মুগ্ধ! ডুপ্লেক্স বাড়ি। একজন দারোয়ান দৌড়ে এসে সালাম দিল, পরিচিত হলো পদ্মজার সঙ্গে। এরপর এলো একজন মধ্যবয়স্ক নারী। সে বোধহয় বাড়ির কাজের লোক। সবাই একসঙ্গে বাড়ির ভেতর ঢুকল। পদ্মজা তার নতুন বাড়ি মন দিয়ে দেখছে। পূর্ব দিক থেকে সদর দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল বিশাল বৈঠকখানা উত্তর দক্ষিণে লম্বা। দক্ষিণ পাশে বারান্দা তাতে নানা ধরনের ফুল ফুটে আছে টবের মধ্যে, মনে হচ্ছে একটা ছোটোখাটো বাগান। বৈঠকখানার দক্ষিণ পশ্চিম কোনার দিকে বেশ বড়ো শোবার ঘর। পদ্মজা প্রশ্ন করার আগে আমির বলল, ‘না, এটা আমাদের ঘর না।’


উত্তর পশ্চিম কোনার দিকে রান্নাঘর এবং টয়লেট। আর এই দুয়ের মাঝে মানে বৈঠকখানার পশ্চিম দিকের মাঝখানটায় খাওয়ারঘর। বৈঠকখানার মাথার ওপর দিকে তাকালে সেখানে ঝুলতে থাকা সোনালি রঙের ঝাড়বাতি দেখা যায়। বৈঠকখানার উত্তর দিকে একটা সিড়ি সাপের মতো পেঁচিয়ে ওপরে উঠে গেছে। আমির পদ্মজাকে নিয়ে সেদিকে এগোল। সিঁড়ি পেরুনোর পর হাতের বাঁ দিকে অনেক বড়ো একটা শোবার ঘর। দামি দামি জিনিসে সৌন্দর্য আকাশছোঁয়া। দুজন একসঙ্গে শোবার ঘরটিতে প্রবেশ করল। পদ্মজা চোখ ঘুরিয়ে সবকিছু দেখছে। আমির বলল, ‘গোসল করে নাও?’


পদ্মজা বোরকা খুলে কলপাড় খুঁজতে থাকল। আমির গোসলখানার দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘এই যে এদিকে ‘


দুজন একসঙ্গে ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বের হয়। পদ্মজা দুই তলাটা আরেকটু দেখার জন্য ডানদিকে মোড় নিলো। প্রথমে চোখে পড়ল বড়ো ব্যালকনি। এরপর আরেকটা শোবার ঘর। ব্যালকনিতে লতাপাতার ছোটো ছোটো টব।


বিরাট অট্টালিকায় সুখে কেটে গেল পাঁচ মাস। লাবণ্য দেশ ছেড়েছে দুই মাস হলো। মাস তিনেক হলো বুয়াও কাজ ছেড়ে দিয়েছে। পদ্মজা আর কাজের লোক নিতে দিল না, সে এক হাতেই নাকি সব পারবে। তবুও আমির একটা বারো বছর বয়সি মেয়ে রেখেছে সাহায্যের জন্য। ভোরের নামাজ পরে রান্নাবান্না করে পদ্মজা। এরপর শাড়ি পালটে নেয় কলেজে যাওয়ার জন্য। আমিরকে ব্লেজার, টাই পরতে সাহায্য করে। প্রথম যেদিন আমিরকে ব্লেজার পরতে দেখেছিল সেদিন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘এই পোশাকের নাম কী? আপনাকে খুব বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।’


আমির হেসে জবাব দিয়েছিল, ‘ব্লেজার। বাইরে থেকে আনা।’


এমন অনেক কিছুই পদ্মজার অজানা ছিল। সবকিছু এখন তার চেনাজানা। এই বিলাসবহুল জীবন বেশ ভালো করেই উপভোগ করছে। মানুষটা সারাদিন ব্যস্ত থাকে। তবুও ফাঁকেফাঁকে টেলিফোনে যোগাযোগ করে। পদ্মজাকে নিয়ে গোডাউন দেখিয়েছে, অফিস দেখিয়েছে। সবকিছু সাজানো, গোছানো। গোডাউনে বিভিন্ন ধরনের পণ্য। কত কত রকমের দ্রব্য। পদ্মজা জীবনে ভালোবাসা এবং অর্থ—দুটোই চাওয়ার চেয়েও বেশি পেয়েছে।


সকাল নয়টা বাজে। আমির তাড়াহুড়ো করছে, তার নাকি আজ দরকারি মিটিং আছে। পদ্মজা শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে দৌড়ে দৌড়ে খাবার পরিবেশন করছে। আমির দুই তলা থেকে নেমেই বলল, ‘আমি গিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কলেজ চলে যেয়ো।’


‘আরে, খেয়ে যাবেন তো।’


‘সময় নেই। আসছি।’


‘খেয়ে যান না।’


‘বলছি তো তাড়া আছে। জোরাজুরি করছো কেন?’


আমির দ্রুত বেরিয়ে যায়। পিছু ডাকতে নেই, তাই পদ্মজা ডাকল না। মনাকে ডেকে বলল, ‘খেয়ে নাও তুমি।’


মনা পদ্মজার সাহায্যকারী। পদ্মজার ছোটোখাটো ফরমায়েশ পালন করে। পদ্মজা বৈঠকখানায় গিয়ে বসল। আজ কলেজে যেতে ইচ্ছা করছে না। ভোরে একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছে। মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি, অকারণে বিষণ্নতায় ছেয়ে আছে মন। অকারণেও না বোধহয়! আমির বিরক্ত হয়ে কথা বলেছে, এজন্যই বোধহয় মনের আকাশে বৃষ্টি নেমেছে। পদ্মজা পুরোটা দিন উপন্যাস পড়ে কাটিয়ে দিল। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে কলিং বেল বেজে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল পদ্মজা। আমির দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে বাতাস হচ্ছে। পদ্মজা বলল, ‘আসুন।’


আমির ভেতরে ঢুকল না। সে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে পদ্মজার দিকে তাকিয়ে আছে। পদ্মজা কপাল কুঁচকাল, ‘কী হলো? আসুন।’


আমির চট করে পদ্মজাকে কোলে তুলে নিলো। পদ্মজা চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘কেউ দেখবে।’


আমির মনাকে ডাকল, ‘মনা? কই রে? দেখে যা।’


‘আপনি ওকে ডাকছেন কেন?’


‘এবার কাউকে দেখাবই।


‘উফফ! ছাড়ুন।’


‘মনা? মনা?’


মনা দুই তলা থেকে নেমে আসে। আমির মনাকে নামতে দেখে বলল, ‘এই দেখ তোর আপাকে কোলে নিয়েছি। দাঁড়া, তোর সামনে একটু আদর করি।’


পদ্মজা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে চাপাস্বরে বলল, ‘মনা কী ভাববে! আমি আর বলব না, কেউ দেখবে। এবার ছেড়ে দিন।’


আমির পদ্মজাকে নামিয়ে দিল। মনা কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কী করবে বুঝতে পারছে না। আমির বলল, ‘যা ঘরে যা।’


মনা এইটা শোনার অপেক্ষায় ছিল। সে দৌড়ে চলে যায়। পদ্মজা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। আমিরকে গুরুজনদের মতো বলল, ‘আক্কেলজ্ঞান কখন হবে আপনার? বয়স তো কম হলো না।’


অবিকল পদ্মজার কথার ধরণ অনুসরণ করে আমির বলল, ‘আর কতদিন কেউ দেখবে কথাটা মুখে থাকবে? বিয়ের তো কম দিন হলো না।’


‘আপনি…আপনি কালাচাঁদ না কালামহিষ।’


‘এটা পূৰ্ণা বলত না? হেহ, আমি মোটেও কালো না।’


‘তো কী? এই যে দেখুন, দেখুন…আমার হাত আর আপনার হাত।’


পদ্মজা হাত বাড়িয়ে দেখায়। আমির খপ করে পদ্মজার হাত ধরে চুমু খেয়ে বলল, ‘এই হাতও আমার।’


পদ্মজা বলল, ‘ঠেসে ধরা ছাড়া আর কী পারেন আপনি? ছাড়ুন।’


আমির পদ্মজার হাত ছেড়ে দিয়ে হাসতে থাকল।

কমেন্ট

1
Helim Hasan Akash · 01 Apr 2026

Nice

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১৫৫৫ - জার্...

Akash 26 Apr, 2026 35
Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফিরেছে নতুন আ...

Akash 26 Apr, 2026 35
আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল
প্রাত্যাহিক আয়োজন

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১...

Akash 26 Apr, 2026 35
আজকের রাশিফল: ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রাত্যাহিক আয়োজন

আজকের রাশিফল: ২৬ এপ্রিল ২০২৬

মেষ রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। এই রাশির বিবাহিত ব্যক্তিরা শ্...

Akash 26 Apr, 2026 34
Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)
রেডিও স্পেসিয়াল

Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফির...

Akash 26 Apr, 2026 35