উপন্যাস ও বই

পদ্মজা-পর্ব ২৭

পদ্মজা-পর্ব ২৭

লাশটি নৌকায় তুলতেই পূর্ণা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে মোর্শেদের পাশ ঘেঁষে বসল। তার মনে হচ্ছে চারিদিক থেকে প্রেতাত্মারা তাকিয়ে আছে, যে কোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘাড় মটকে দেবে। ঘাড় মটকানোর কথা ভাবতেই পূর্ণার ঘাড় শিরশির করে উঠল। ‘ভূত, ভূত’ বলে চেঁচিয়ে উঠল সে। হঠাৎ পূর্ণার চিৎকার শুনে মোর্শেদ ভয় পেয়ে যান। এমনিতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে লাশ দেখে।


তিনি পূর্ণাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কোনহানে ভূত? ডরাইস না।’


মাথার কাছে বাঁধা দড়িটা খুলে কাপড় সরাতেই একটা মৃত মেয়ের মুখ দেখা গেল। হেমলতা আর পদ্মজা দুজনই ভেতরে ভেতরে চমকে উঠল। হেমলতা এদিক-ওদিক তাকিয়ে মানুষের উপস্থিতি দেখে নিলেন। এরপর কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলেন, ‘চিনি না তো। তুই চিনিস?’


পদ্মজা মাথা নাড়িয়ে জানাল, সে চেনে না। পরপরই মোর্শেদকে ডাকল পদ্মজা, ‘আব্বা, দেখেন তো আপনি চিনেন নাকি?


মোর্শেদ উঠে আসতে চাইলে পূর্ণা ধরে রাখে। মোর্শেদ পূর্ণাকে নিয়েই এগিয়ে আসেন। মৃত মেয়েটার মুখ দেখে বললেন, ‘না, এরে চিনি না।’


হেমলতা চিন্তায় পড়ে যান, শরীরের পশম কাঁটা দিচ্ছে। চারিদিক অন্ধকারে ঢাকা, হীমশীতল বাতাস; আর সামনে সাদা কাপড়ে মোড়ানো এক মেয়ের লাশ।


তিনি ব্যথিত কণ্ঠে বললেন, ‘কোন মায়ের বুক খালি হলো কে জানে!’


পদ্মজা বিড়বিড় করে, ট্রলারের এক জনকে চেনা চেনা লাগছিল আম্মা।


হেমলতা ধৈর্যহারা হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কে? চিনেছিস? নাম কী? জানিস?’


পদ্মজা ভাবছে। গভীর ভাবনায় ডুবে কিছু ভাবছে। হেমলতার প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘নাম জানি না। দাঁড়াও, আমি বলি লোকটা কেমন!


পদ্মজা চোখ খুঁজে ফিরে গেল কিছুক্ষণ আগের মুহূর্তে। চোখ বোজা অবস্থাতেই বলল, ‘আব্বা যখন বলল, কে রে? তখন একটা লোক আমাদের দিকে তাকিয়েছিল। লোকটার চোখগুলো ভীষণ লাল। অনেক মোটা, খুব কালো। মাথার চুল ঝুটি বাঁধা ছিল। এমন একজন লোক আমি স্কুল থেকে ফেরার পথে অনেকবার দেখেছি।’ কথা শেষ করেই পদ্মজা চোখ খুলে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, ‘লোকটার দেখা পেলে আমি ঠিক চিনে ফেলব আম্মা।’


‘চিনে কী হবে? প্রমাণ তো নেই। আর মেয়েটা মারা গেছে নাকি খুন সেটা তো জানি না।’


‘প্রমাণ নেই তা ঠিক। কিন্তু মেয়েটা খুন হয়েছে, আম্মা। এই দেখো, মেয়েটার গলায় ক


দাগ। আর পেটের কাছে দেখো রক্তের দাগ। নদীর পানি পুরোটা রক্ত মুছে দিতে পারেনি।’


হেমলতা অবাক হয়ে পদ্মজার কথামতো খেয়াল করে দেখেন। সত্যি তো! তিনি বিস্ময় নিয়ে বললেন, ‘একটার পর একটা খুন! হানিফের পর প্রান্তর বাপ…এরপর এই মেয়ে। আমি বুঝতে পারছি না, কে বা কারা এমন করছে।’


‘ওই লোকটার দেখা যদি আরেকবার পাই—আমি ঠিক এর রহস্য বের করব,’ বলল পদ্মজা।


মৃত মেয়েটার মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন হেমলতা। এরপর দড়ি দিয়ে আগের মতো বেঁধে মোর্শেদকে বললেন, ‘কলাপাড়ার দিকে যাও।’


‘ওখানে কিয়ের কাম?’ বললেন মোর্শেদ।


হেমলতা শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘কলা গাছের ভেলা বানিয়ে লাশ ভাসিয়ে দেব। পানিতে ফেললে কেউ পাবে না। ভাসিয়ে দিলে কেউ না কেউ পাবে। হয়তো মেয়েটার পরিবারও খুঁজে পাবে! আমাদের বাড়িতে এখন লাশ নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। অনেক মানুষ আছে। সবাই ভয় পাবে। বিয়ের আমেজটা চলে যাবে। তাড়াতাড়ি যাও, কলাপাড়ার দিকে নৌকা ঘুরাও।’


.


সকাল সকাল গায়ে হলুদ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বউ এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। বাড়ি ভরতি মানুষ। কলাগাছের ছাদ বানিয়ে সবাই অপেক্ষা করছে নতুন বউয়ের জন্য। হেমলতা কিছুতেই পদ্মজাকে ডাকতে দিচ্ছেন না। দুপুরের আজান পড়তেই পদ্মজা চোখ খোলে। যখন মনে পড়ল আজ তার গায়ে হলুদ তখন সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। সেই কাকডাকা ভোরে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়েছিল। তারপর আর কিছু মনে নেই। বালিশের পাশে হলুদ শাড়ি রাখা। পদ্মজা দ্রুত শাড়িটি পরে নিয়ে ডাকল পূর্ণাকে। বাইরের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। পদ্মজা দরজা খুলতেই নয় বছর বয়সি একটা মেয়ে চেঁচিয়ে বাইরে খবর দিল, ‘পদ্ম আপার ঘুম ভাঙছে।’


হেমলতা রান্নাঘরের সামনে বসে মুরগি কাটছিলেন।


হানি উঠান থেকে হনহনিয়ে হেঁটে এসে হেমলতাকে শ্লেষাত্মক কণ্ঠে বললেন, ‘এবার তোর চাঁদকে নিয়ে যেতে পারি?’


হেমলতা হেসে অনুমতি দিলেন, ‘যাও।’


হানি, মনজুরাসহ সম্পর্কে ভাবি হয় এমন আরো দুজন পদ্মজাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হলো। গান গাওয়ার জন্য ‘গীত গাওনি’ মহিলাদের খুব সমাদর করে আনা হয়েছে।


গ্রামের মহিলারা মিলে গোলাকার হয়ে বসে গানের জলসা তৈরি করেছে। যারা যারা গান গাইতে পারে, তারা চারপাশে ঘুরে ঘুরে গাইছে।


পদ্মজাকে দেখে সবার মনোযোগ তার দিকে চলে গেল। গায়ে হলুদের স্থান বাড়ির পেছনে। মোর্শেদ পথ আটকে গামছা কোমরে বাঁধতে বাঁধতে বললেন, ‘আমার ছেড়িরে আমি লইয়া যামু।’


কথা শেষ করে মোর্শেদ পদ্মজাকে পাঁজকোলা করে তুলে নিলেন। হানি চেঁচিয়ে উঠে বললেন, ‘আরে মিয়া করেন কী! দুলাভাইরা কোলে নেয় তো।’


‘বাপ নিলে বিয়া অশুদ্ধ হইয়া যাইব না।’


পদ্মজা লজ্জায় শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। অজানা অনুভূতিতে তার হাত পা কাঁপছে। উপস্থিত মানুষের উচ্ছ্বাস দ্বিগুণ বেড়ে যায়। প্রেমা-প্রান্ত অন্যান্য শিশুদের নিয়ে খুশিতে লাফাচ্ছে, একজন আরেকজনকে রং মাখিয়ে দিচ্ছে। কলা গাছের ছাদের নিচে খাটের ছোটো চৌকি রাখা। সেখানে পদ্মজাকে দাঁড় করিয়ে দেন মোর্শেদ। সামনে সাতটি বদনা, দশটি কলসি ভরতি পানি। একটি কুলোয় রাখা দূর্বা, ধান, হলুদ বাটা, হলুদ শাড়ি, ব্লাউজ, তোয়ালে ও সাবান।


গীত গাওনিরা নেচে নেচে গীত গাইছে। শোনা যাচ্ছে—


‘কালা বাইগুনের (বেগুনের) ধলা ফুল

 রুমালে গাঁথিয়া তুল

কইনা লো তোর দয়াল বাবাজির মায়া তুল।

বরির (বরইয়ের) গাছে কুমড়ার ফুল

রুমালে গাঁথিয়া তুল

কইনা লো তোর দয়া চাচাজির মায়া তুল।’


‘কন্যা ডাক দেও তোর জননী না মাইরে

মাও দিয়া যাওক সোনা মুখে হলদিরে

হলুদা, ডাক দেও তোর জনমদাতা বাপেরে

বাবা দিয়ে যাউক তোর সোনা মুখে হলদিরে।’


গীতের তালে তালে ছেলেমেয়েরা একজন আরেকজনকে জোর করে ধরে হলুদ মাখিয়ে দিচ্ছে। পদ্মজার জন্য রাখা হলুদ অনেকেই নেয়ার জন্য ওঁত পেতে আছে, হানির জন্য পারছে না। হানি পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলে অনন্ত এসে হলুদ চাইলে হানি মার দেবেন বলে তাড়িয়ে দিলেন। হেমলতা ভিড় কমিয়ে চারিদিক পর্দা দিয়ে ঘিরে ফেলেন। মানুষে গিজগিজ করছে বাড়ি, অথচ দিন কয়েক আগে এরাই পদ্মজার সম্মান লুটে নিতে দেখেছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এই গ্রামবাসীর প্রতি কোনো সহানুভূতি নেই তার। ছয়-সাত জন মহিলাকে নিয়ে হলুদের গোসল শেষ করলেন। অন্যান্য মহিলাদের না নেয়াতে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গেল! গায়ে হলুদ করতে হয় সবাইকে নিয়ে, সবার সামনে…আনন্দ করতে করতে। হেমলতা কেন শুধুমাত্র ছয়-সাত জন নিয়ে করছেন? তিনি অবশ্য কারো কোনো কথার জবাবই দিলেন না।


গোসল শেষ করে পদ্মজাকে হলুদ মসলিন শাড়ি পরানো হলো। কানের কাছে মনজুরা গুনগুন করে কাঁদছেন। পদ্মজার শুনতে ভালো লাগছে না। বিয়ে হলে নাকি এক সপ্তাহ আগে থেকে কান্নাকাটি শুরু হয়। গায়ে হলুদের দিন আত্মীয়রা কাদায় গড়াগড়ি করে কাঁদে। অথচ পদ্মজা, হেমলতা শান্ত!


পদ্মজাকে গায়ে হলুদের খাবার দেয়া হলো। বিশাল এক থালা; তাতে কয়েক রকমের পিঠা, আস্ত একটি মুরগি, পোলাও, শাকসহ নানা পদ। পদ্মজা খা আগে অন্যরা কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। লোক সমাগম কমতেই হেমলতা আলাদা করে প্লেটে করে ভাত আর মুরগির মাংস নিয়ে আসেন, নিজ হাতে খাইয়ে দেন মেয়েকে।


খাওয়ার মাঝে পদ্মজার মনে পড়ে মনজুরা তখন বলেছিলেন, ‘বিয়ের পর মেয়েরা পর হয়ে যায়। মা-বাবা পর হয়ে যায়। স্বামী আর স্বামীর বাড়িই সব। মা-বাপের সঙ্গে দেখা করতেও তাদের অনুমতি লাগে।’


পদ্মজা হেমলতার দিকে তাকিয়ে ভাত চিবোয়। হেমলতা খেয়াল করে দেখেন, পদ্মজা তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক ফেলছে না। চোখজুড়ে চিকচিক করছে জল।


তিনি শান্ত স্বরে বললেন, ‘খাওয়ার সময় কাঁদতে নেই।’


আকস্মিক পদ্মজা ফোঁপাতে শুরু করল। হেমলতা সান্ত্বনা পর্যন্ত দিলেন না, পরবর্তী লোকমা মুখে তুলে দিলেন। ফোঁপাতে ফোঁপাতে খাবার শেষ করল পদ্মজা। চোখের জলে বুক ভিজে একাকার। হেমলতা মেয়ের সামনে শক্ত থাকলেও, ঘরের বাইরে এসে হাতের উলটো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন। কী যে যন্ত্রণা হচ্ছে বুকে! কাঁদতে পারলে বোধহয় ভালো হতো। কিন্তু কাঁদার সময় কোথায়? সবার সামনে তো আর কাঁদতে পারেন না। ভিড় কমলে কাঁদবেন, অনেক কাঁদবেন, জীবনে শেষ বারের মতো কাঁদবেন। এরপর আর কখনো কাঁদবেন না …


…কোনোদিনও না।


পদ্মজার দুই হাতে গাছের মেহেদি লাগানো হচ্ছে। উঠানে বড়ো চৌকি পেতে তার চারিদিকে রঙিন পর্দা টাঙানো হয়েছে। কাগজের ফুল মাথার উপর ঝোলানো। চারিদিকে ঘিরে রয়েছে মেয়েরা। সামনের খালি জায়গায় চলছে নাচ।


ঠিক তখনই সেখানে উপস্থিত হলো হাওলাদার পরিবার—লাবণ্য, রানি এবং তাদের আত্মীয়স্বজন; সঙ্গে নিয়ে এসেছে বউয়ের বেনারসি, গহনা। হানি ছুটে এসে সবার আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন। সবার শেষে বাড়িতে ঢুকল আমির। বিয়ের আগের দিন রাতে বরের আগমন সবাইকে খুব হাসাল। কেউ কেউ বলল, এত সুন্দর বউ দূরে রাখার আর তর সইছে না তাই চলে এসেছে। আমির সেসব পাত্তা দিল না। সোজা হেমলতার কাছে গেল। গিয়ে বলল, ‘আম্মা, পদ্মজার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’


আমিরের অকপট অনুরোধ। হেমলতা ভীষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এমন ছেলে তিনি দুটো দেখেননি।


আমির আবার বলল, ‘বেশিক্ষণ না, একটু সময় চাইছি।’ আমিরের কণ্ঠ পরিষ্কার। মাথা নিচু। পরিবারের ভালো শিক্ষাই পেয়েছে। তবে লাজলজ্জা একদমই নেই।


হেমলতা মৃদু হেসে বললেন, ‘ঘরে গিয়ে বসো। পদ্ম আসছে।’


আমির হেমলতার পা ছুঁয়ে সালাম করে পদ্মজার ঘরের দিকে চলে গেল। হেমলতা পদ্মজাকে ডেকে নিয়ে এসে বললেন, আমির কথা বলতে চায়। ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু, কিন্তু না তো করা যায় না। কোনো বিশেষ দরকার হয়তো।’


পদ্মজা ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। পেছন ফিরে তাকাতেই হেমলতা ইশারায় যেতে বললেন। পদ্মজা ঘরে ঢুকে ডাগর ডাগর চোখ মেলে আমিরের দিকে তাকাল। আমিরকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে, মনে হচ্ছে কিছু নিয়ে খুব চিন্তিত। আমির পদ্মজাকে দেখেই হাসল। বলল, ‘বসো।’


পদ্মজা বিছানার এক পাশে বসে। অন্য পাশে আমির বসে প্রশ্ন করে, ‘যা প্রশ্ন করি সত্যি বলবে।’


পদ্মজা দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ‘আমি মিথ্যে বলি না।’


আমির অসহায়ের মতো বলল, ‘তুমি কি মন থেকে এই বিয়েতে রাজি?’


পদ্মজা চকিতে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, ‘আম্মা যখন যা করেছেন তাই আমি মন থেকে মেনে নিতে পেরেছি।’


আমির বলল, ‘লিখন শাহ তো তোমাকে পছন্দ করে।’


‘জানি। আর আপনি জানেন সেটাও জানি।’


আমি আমাদের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর জেনেছি। তুমি…তুমি মনে কিছু নিয়ো না, বলতে চাইছি, যদি তোমার আমাকে অপছন্দ হয় আর লিখন শাহকে ভালোবেসে থাকো বলতে পারো। আমি বিয়ে ভেঙে দেব।’


পদ্মজা অপমানে লাল হয়ে গেল। থমথমে গলায় বলল, ‘অবিশ্বাস থাকলে বিয়ে না হওয়াই ভালো। আপনি ভেঙে দিতে পারেন।’


আমিরের চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। পদ্মজা ধারালো স্বরেও কথা বলতে পারে! আমির ইতস্তত করে বলল, ‘আমার কোনো অবিশ্বাস নেই। তোমার মনে কেউ না থাকলে বিয়ে আমার সঙ্গেই হবে। আর কারোর সঙ্গে হতে দেব না।’


পদ্মজা কিছু বলল না। উঠে যেতে চাইলে আমির অনুনয়ের সঙ্গে বলল, ‘একবার হাত ধরা যাবে?’


‘আজ নয়, আগামীকাল।’ বলার সময় পদ্মজার ঠোঁটে দেখা গেল হাসির রেখা।


আমির সেটা খেয়াল করে মুগ্ধস্বরে বলে উঠল, ‘সুবহানআল্লাহ।’


.


বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। পদ্মজা বধূ সেজে বসে আছে। দুই পাশে বসে আছে পূর্ণা ও প্রেমা। কাজী বিয়ে পড়াচ্ছেন। অনেকক্ষণ ধরে পদ্মজাকে কবুল বলতে বলছেন। পদ্মজা কিছুতেই বলছে না। সে একমনে হেমলতাকে খুঁজছে। বউ কবুল বলছে না শুনে অনেকে ভিড় জমিয়েছে। হেমলতা সেই ভিড় ভেঙে ঘরে ঢুকলেন। হেমলতাকে দেখে পদ্মজার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল, ছলছল চোখ নিয়ে তিনবার কবুল বলল সে। হেমলতার দুই চোখে পানি, ঠোঁটে হাসি। পদ্মজাকে বধূ সাজাবার পর এই প্রথম দেখলেন তিনি। লাল বেনারসিতে পদ্মজার রূপ যেন গলে গলে পড়ছে। পাশের ঘরে কে যেন কাঁদছে! হেমলতা দেখতে গেলেন।


আয়না দেখানো পর্ব শুরু হয়। আয়নায় তাকাতেই আমির চোখ টিপল। পদ্মজা লজ্জা পেয়ে সরিয়ে নিলো দৃষ্টি। আমির সবার চোখের আড়ালে খপ করে ধরে ফেলল পদ্মজার এক হাত। স্বামীর অধিকার নিয়ে ধরা প্রথম স্পর্শে কেঁপে উঠে পদ্মজা। অদ্ভুত এক অনুভূতিতে তলিয়ে যেতে থাকে সে।


আমির ফিসফিস করে বলল, ‘এই যে ধরলাম, মৃত্যুর আগে ছাড়ছি না।’ বিয়ে বাড়ির কোলাহল কমে গেছে। বিদায়ের পালা চলছে। করুণ কান্নার স্বরে চারিদিক হাহাকার করছে। মনজুরা, হানি কেঁদে কুল পাচ্ছে না। মোর্শেদ নদীর ঘাটে বসে গোপনে চোখের জল ফেলছেন। পূর্ণা পদ্মজার গলা জড়িয়ে সেই যে কান্না শুরু করেছে থামছেই না। কাঁদছে প্রেমা ও প্রান্ত। একটা মেয়ের বিয়ের বিদায় পর্ব কতটা কষ্টের তা শুধু সেই মেয়ে আর তার পরিবার জানে। পদ্মজা পূর্ণার মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বার বার বলছে, ‘বোন, বোন আমার। মন খারাপ করে থাকবি না কিন্তু। একদম কাঁদবি না। আমি আসব। তুইও যাবি। আমার খুব কষ্ট হবে রে বোন। আর কাঁদিস না। এভাবে কাঁদলে অসুস্থ হয়ে যাবি।


একজন তাড়া দেয়, সন্ধে হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি করুন।’


পদ্মজা আকুল হয়ে কেঁদে ডাকল, ‘আম্মা…আমার আম্মা কোথায়? আম্মা, ও আম্মা।’


হেমলতা লাহাড়ি ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পদ্মজার ডাকে সাড়া দিতে সামনে এগোতে থাকেন। প্রতি কদমে কদমে বুক ব্যথায় চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তবুও হাসার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পারছেন না। যে মেয়ের জন্য তিনি নতুন করে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন সেই মেয়ের আজ বিদায়! সারাজীবনের জন্য অন্যের ঘরে চলে যাবে। হেমলতাকে দেখেই পদ্মজা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। হেমলতা দ্রুত চোখের জল মুছে, পদ্মজাকে আদুরে কণ্ঠে বললেন, ‘এভাবে কাঁদতে নেই মা। বিয়ে তো হবারই কথা ছিল।’


‘আম্মা, তোমাকে ছাড়া কেমন করে থাকব?’


‘সবাইকেই থাকতে হয়। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে মা।


হেমলতা পদ্মজার চোখেমুখে কপালে চুমু খেয়ে, দুই চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন, শ্বশুর বাড়ির সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকবি। নিজের খেয়াল রাখবি।’


পদ্মজা হাউমাউ করে কাঁদছে। হেমলতাকে জোরে চেপে ধরে বলল, ‘আম্মা আমি যাব না। আম্মা যাব না আমি।’


হেমলতা পদ্মজার মুখের দিকে চাইতে পারছেন না। ভাঙা গলায় আমিরকে ডেকে বললেন, ‘বাবা, নিয়ে যাও আমার মেয়েকে। ওর খেয়াল রেখো। ওর আব্বা ঘাটে বসে আছে। ডাকতে হবে না, একা থাকুক। তোমরা পদ্মকে নিয়ে যাও। সন্ধে হয়ে যাচ্ছে।’


আমির নম্রকণ্ঠে বলল, ‘পদ্মজাকে সারাজীবন আগলে রাখব। আপনি চিন্তা করবেন না।


হেমলতা কৃতজ্ঞচিত্তে তাকিয়ে রইলেন শুধু কিছু বলতে পারলেন না। চোখ বেয়ে টুপটুপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে মাটিতে পদ্মজার বেনারসিতে।


আমির পদ্মজাকে পাঁজকোলা করে নেয়। পদ্মজা আকুতিভরা কণ্ঠে হেমলতাকে ডেকে অনুরোধ করে, ‘আম্মা আমাকে ধরো। ওরা নিয়ে যাচ্ছে, আম্মা…’


হেমলতা মুখ ঘুরিয়ে নেন। পূর্ণা দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পদ্মজাকে পালকিতে বসিয়ে তার গালে দুই হাত রেখে আমির বলল, ‘কেঁদো না আর। একদিন পরই আসব আমরা।’


পদ্মজা দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠে। সব কিছু শূন্য লাগছে। মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গেছে। পালকি ছুটে চলছে শ্বশুরবাড়ি।


পূর্ণা হেমলতাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আম্মা কেন বিয়ে দিলে আপার? তোমার কি কষ্ট হচ্ছে না?’


হেমলতা হাঁটুভেঙে মাটিতে বসে পড়েন। পূর্ণাকে জড়িয়ে ধরে গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। উপস্থিত সবার কান্না থেমে যায়। তিনি বলেন, ‘আমি যদি পারতাম তাহলে আমার পদ্মর বিয়ে দিতাম না পূর্ণা। ও যে আমার সাত রাজার ধনের চেয়েও বেশি।’


হানি বরাবরই কাঁদুক স্বভাবের। হেমলতা কখনো কাঁদে না। সেই হেমলতাকে এভাবে কাঁদতে দেখে তিনি নিজেও কান্না লুকিয়ে রাখতে পারলেন না।


হেমলতার মাথা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে ভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘এটাই তো নিয়ম। কেঁদে আর কী হবে?’


হেমলতা মুহূর্তে ছোটো বাচ্চা হয়ে গেলেন। হানিকে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বললেন, ‘আপা, আপা ওরা আমার মেয়ে নেয়নি। আমার কলিজা ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। আপা, কেন বিয়ে দিতে হলো আমার পদ্মর?’


মনজুরা হেমলতার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দেন, ‘দেখিস পদ্ম খুব ভালো থাকবে। ও খুব ভালো মেয়ে।’


হেমলতা হানিকে ছেড়ে মনজুরাকে জড়িয়ে ধরলেন। হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আম্মা, আম্মা তুমি কখনো আমাকে কিছু দাওনি এইবার আমার এই মরণ কষ্টটা কমিয়ে দাও। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আম্মা, আমার পদ্মকে ছাড়া আমি কীভাবে থাকব?


মনজুরার বুক ধুকপুক করছে। জন্মের পর হেমলতা কী কখনো এভাবে কেঁদেছে? মনে পড়ছে না। তিনি পারেননি হেমলতার এই কষ্ট কমাতে। শুধু বুকের সঙ্গে চেপে ধরে রাখলেন। এভাবে যদি ছোটো থেকে আগলে রাখতেন, হেমলতার জীবনটা এত কষ্টের হতো না।


.


পদ্মজা ছটফট করছে। কিছু ভালো লাগছে না। ইচ্ছে হচ্ছে ছুটে যেতে মায়ের কাছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। এখুনি মারা যাবে হয়তো। পদ্মজা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, ‘থামো তোমরা, থামো। আল্লাহর দোহাই লাগে থামো।’


পদ্মজার চিৎকার শুনে আমির ভড়কে যায়, বেয়াড়াদের দ্রুত থামতে বলে। পালকি থেমে যায়। পদ্মজা পালকি থেকে মাটিতে পা রেখেই মোড়ল বাড়ির দিকে ছুটতে থাকল। কেউ আটকে রাখতে পারল না। সবাইকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে ছুটে চলেছে সে মায়ের বুকে। আমির শুধু চেয়ে রইল। সন্ধ্যা নামার পূর্ব মুহূর্তে একটা লাল বেনারসি পরা অপরূপ সুন্দরী মেয়ে ছুটছে। দেখতেও ভালো লাগছে।

কমেন্ট

0

এখনো কোনো কমেন্ট নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১৫৫৫ - জার্...

Akash 26 Apr, 2026 35
Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফিরেছে নতুন আ...

Akash 26 Apr, 2026 35
আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল
প্রাত্যাহিক আয়োজন

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১...

Akash 26 Apr, 2026 35
আজকের রাশিফল: ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রাত্যাহিক আয়োজন

আজকের রাশিফল: ২৬ এপ্রিল ২০২৬

মেষ রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। এই রাশির বিবাহিত ব্যক্তিরা শ্...

Akash 26 Apr, 2026 34
Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)
রেডিও স্পেসিয়াল

Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফির...

Akash 26 Apr, 2026 35