উপন্যাস ও বই

পদ্মজা-পর্ব ১১

পদ্মজা-পর্ব ১১

মাঘ মাস চলছে। কেটে গেছে চার মাস। শুষ্ক চেহারা আর হিমশীতল মন নিয়ে পদ্মজা বসে আছে নদীর ঘাটে, গুনে গুনে তিন নম্বর সিঁড়িতে। নাকের ডগায় মেট্রিক পরীক্ষা, দিনরাত পড়তে হচ্ছে। সে নিয়ম করে প্রতিদিন ভোরে পড়া শেষ করে ঘাটে এসে বসে, নিজের অনুভূতিদের সঙ্গে বোঝাপড়া করার জন্য। কখনো উদাস হয়ে আবার কখনো লাজুক মুখশ্রী নিয়ে ভাবে কারো কথা। সেই যে চিঠি দিয়ে হারাল, আর সাক্ষাৎ মিলল না তার। কখনো কি মিলবে? তিনি কি আসবেন? এক চিঠি প্রতিদিন নিয়ম করে পড়ে পদ্মজা। ধীরে ধীরে অনুভব করে তার মধ্যে আছে অন্য আরেক সত্তা…যে সত্তা প্রতিটি মেয়ের অন্তঃসালের গভীরে জেঁকে বসে থাকে ভালোবাসার অনুভূতি নিয়ে। পূর্ণা শীতের চাদর মুড়ি দিয়ে পদ্মজাকে খুঁজছে। দুই দিন আগে তার অষ্টম শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। হিমেল হাওয়ার হাড় কাঁপানো শীতে থেমে থেমে কাঁপছে সে।


পদ্মজাকে ঘাটে বসে থাকতে দেখে পেছন থেকে ডাকল, ‘আপা?’


পদ্মজা তাকাল। বলল, ‘কী?’ পরপরই উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল, ‘আম্মা আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছে?’


পূর্ণা পদ্মজার পাশ ঘেঁষে বলল, ‘না, আম্মার কিছু হয়নি।’


পদ্মজা হাঁফ ছেড়ে বলল, ‘আম্মা সারাদিন সেলাই কাজ করে। একদিকে তাকিয়ে থাকে, এক জায়গায় বসে থাকে। এজন্যই শরীরে এত অশান্তি। দুর্বল হয়ে পড়েছে। আব্বাকে বলিস, আম্মারে নিয়ে সদরে যেতে। আমার কথা তো শুনবে না।


‘আচ্ছা।’


দুজন নদীর ওপারে তাকাল। অতিথি পাখির মেলা সেখানে। রোমাঞ্চকর আকর্ষণ। এত পাখি দেখে মন ভরে গেল। পাখিদের কলকাকলিতে এলাকা মুখরিত। এপার থেকেও শোনা যাচ্ছে। কোত্থেকে দৌড়ে আসে প্রান্ত। সে চার মাসে শুদ্ধ ভাষা রপ্ত করে নিয়েছে ভালোভাবে। এসেই বলল, ‘আপারা, কী করো?’


পূর্ণা বলল, ‘পাখি দেখি। আয়, তুইও দেখ।’


প্রান্ত দূরে চোখ রাখল। সকালের ঘন কুয়াশার ধবল চাদরে ঢাকা নদীর ওপার। পাখিদের ভালো করে চোখে ভাসছে না। শীতের দাপটে প্রকৃতি নীরব। তাই পাখির কলকাকলি শোনা যাচ্ছে দারুণভাবে। প্রান্ত বলল, ‘বড়ো আপা, একটা ধরে আনি?’


‘একদম না। পাখি ধরা ভালো না। অতিথি পাখিদের তো ভুলেও ধরা উচিত না। ওরা আমাদের দেশে অতিথি হয়ে এসেছে।’


প্রান্ত চুপসে গেল। ঠোঁট উলটে বলল, ‘আচ্ছা।’


‘তোরা এইহানে কী করস?’


মোর্শেদের কণ্ঠস্বর শুনে তিনজন ঘুরে তাকাল। প্রান্ত হাসিমুখে ছুটে এসে বলল, ‘আব্বা, আমি আজ তোমার সঙ্গে মাছ ধরতে যাব।’


মোর্শেদ প্রান্তকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, ‘তোর মায় আমার লগে কাইজ্জা করব।’


‘আম্মাকে আমি বলব।’


‘আইচ্ছা যা, তুই রাজি করাইতে পারলে লইয়া যামু।’


মোর্শেদ গত দুই মাস ধরে প্রান্তকে চোখে চোখে রাখছেন। ছেলে নেই বলেই হয়তো! প্রতিটা বাবা-মায়েরই একটি ছেলের আশা থাকে।


হেমলতা পর পর তিনটা মেয়ে জন্ম দিলেন। এ নিয়ে মোর্শেদ কখনো অভিযোগ করেননি। তবে মনে মনে খুব করে একটা ছেলে চাইতেন। প্রান্তকে যখন প্রথম আনা হলো, ভিক্ষুকের ছেলে বলে তার খুব রাগ হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রান্তকে চোখের সামনে ঝাঁপাতে-লাফাতে দেখে ছেলের জন্য রাখা মনের শূন্যস্থানটা নাড়া দিয়ে ওঠে। মোর্শেদ দুই হাত বাড়িয়ে দেন অনাথ ছেলেটির দিকে। এখন দেখে আর বোঝার উপায় নেই, মোর্শেদ আর প্রান্তের মধ্যে রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। মোর্শেদ কাঠখোট্টা গলায় দুই মেয়েকে বললেন, ‘সদরে যাইয়াম। তোদের দুজনের লাইগা চাদর আনতাম না সুইডার?’


কথাটি শুনে পদ্মজা দারুণভাবে চমকাল। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু পেলে মানুষ কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। পদ্মজার অবস্থাও তাই হলো। খুশি প্রকাশ করার মতো পথ খুঁজে পাচ্ছে না, স্নায়ু কোষ থমকে গেছে। শীতের তাণ্ডবে প্রকৃতি বিবর্ণ, অথচ তার মনে হচ্ছে, বসন্তকাল চলছে। ঢোক গিলে ঝটপট উত্তর দিল, ‘আব্বা, তোমার যা পছন্দ তাই এনো।’


খুশিতে পদ্মজার গলা কাঁপছে। মোর্শেদ অনুভব করলেন সেই কাঁপা গলা। গত সপ্তাহের ঘটনা, মধ্যরাতে রমিজের মেয়ে এক ছেলের সঙ্গে ধরা পড়ে। অলন্দপুরে সে কী তুলকালাম তাণ্ডব! ছেলেটিকে ন্যাড়া করে জুতার মালা পরিয়ে পুরো অলন্দপুর ঘুরানো হয়েছে। আর মেয়ের পরিবারকে মাতব্বর সমাজ থেকে বিচ্যুত করেছেন। পদ্মজা অপূর্ব সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও আজও কোনো চারিত্রিক দোষ কেউ দিতে পারেনি। মেয়েটার দ্বারা কোনো অনৈতিক কাজ হয়নি। তার ঘরে যেন সত্যি একটা পদ্মফুলের বাস! ইদানীং মোর্শেদ পদ্মজাকে নিয়ে দোটানায় ভোগেন। খারাপ ব্যবহারটা আগের মতো আসে না। তিনি দ্রুত জায়গা ছেড়ে চলে যান।


সকাল সকাল কলস ভরে খেজুরের মিষ্টি রস নিয়ে এলেন মোর্শেদ প্রেমা খেজুরের রস দেখেই বলল, ‘আম্মা, পায়েস খাব।


হেমলতা সমর্থন করলেন, ‘আচ্ছা, খাবি।’


সূর্য অনেক দেরিতে উঠল। প্রকৃতির ওপর সূর্যের নির্মল আলো ছড়িয়ে পড়েছে। আলোতে তেজ নেই। চার ভাই-বোন কাঁচা খেজুরের রস নিয়ে উঠানে বসল পাটি বিছিয়ে। খেজুরের কাঁচা রস রোদে বসে খাওয়াটাই যেন একটা আলাদা স্বাদ, আলাদা আনন্দের। পায়েসের জন্য তো নারিকেল দরকার তাই মোর্শেদ নারিকেল গাছে উঠেছেন।


আচমকা পদ্মজা প্রশ্ন করল, ‘আজ কী সোমবার?’


পূর্ণা কথা বলার পূর্বে হেমলতা বারান্দা থেকে বললেন, ‘আজ তো সোমবারই। কেন?’


পদ্মজা খেজুরের বাটি রেখে ছুটে যায় বারান্দায়।


‘আজ স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল আম্মা। ঝুমা ম্যাডাম বলেছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। সবাইকে যেতে বলেছেন।’


‘আমায় বলে রাখতি। সামনে পরীক্ষা। গুরুত্বপূর্ণ দেখে পড়া দিবে বোধহয়, এজন্যই ডেকেছে। তাড়াতাড়ি যা। এই পূর্ণা, তুইও যা।’


দুই বোন তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে দ্রুত বের হয়। সূর্য উঠলেও কনকনে শীতটা রয়ে গেছে। দুজনের গায়ে মোর্শেদের আনা নতুন সোয়েটার। পদ্মজা যখন মোর্শেদের হাত থেকে সোয়েটার পেল তখন আর আবেগ লুকিয়ে রাখতে পারেনি। মোর্শেদের সামনেই হাউমাউ কেঁদে দিল! তার কান্না মোর্শেদের হৃদয় স্পর্শ করে। কিন্তু মোর্শেদ নিজের অহংবোধের তাড়নায় দুর্বলতা প্রকাশ করেন না, পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, ফেরেন অনেক রাতে। পূর্ণা হাঁটার মাঝে বলল, ‘আব্বার পছন্দ ভালো তাই না আপা?’


‘কীসের পছন্দ?’


‘সোয়েটারগুলো কী সুন্দর।’


ধান


পদ্মজা হাসতেই সামনের দাঁতগুলো ঝিলিক দিল। হাতের ডান পাশে ধানখেত। ধান গাছের ডগায় থাকা বিন্দু বিন্দু জমে থাকা শিশির রোদের আলোয় ঝিকমিক করছে। অনেকে হাতে কাঁচি নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে ধ কাটার। বাতাসে নতুন ধানের গন্ধ। হঠাৎ পূর্ণা চেঁচিয়ে উঠল, ‘আপারে, লিখন ভাই।’


পদ্মজার নিশ্বাস এলোমেলো হয়ে পড়ে। মুহূর্তে বুকের মাঝে তাণ্ডব শুরু হয়। পূর্ণার দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছনে তাকাল সে। লিখন ব্যস্ত পায়ে এদিকেই আসছে। তার পাশে চার ফুট উচ্চতার মগা।


পদ্মজা অজানা আশঙ্কায় চোখ ফিরিয়ে নিলো। রুদ্ধশ্বাসে পূর্ণাকে বলল, ‘এখানে আর এক মুহূর্তও না।


কথা শেষ করেই সে স্কুলের দিকে হাঁটা শুরু করে। পূর্ণা অবাক হয়। কিন্তু, এ নিয়ে রা করল না। লিখন পেছন পেছন আসছে। পদ্মজার বুক কাঁপছে বিরতিহীন ভাবে। তার চাহনি বিক্ষিপ্ত, হৃদয় অশান্ত।

কমেন্ট

0

এখনো কোনো কমেন্ট নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১৫৫৫ - জার্...

Akash 26 Apr, 2026 35
Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফিরেছে নতুন আ...

Akash 26 Apr, 2026 35
আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল
প্রাত্যাহিক আয়োজন

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১...

Akash 26 Apr, 2026 35
আজকের রাশিফল: ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রাত্যাহিক আয়োজন

আজকের রাশিফল: ২৬ এপ্রিল ২০২৬

মেষ রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। এই রাশির বিবাহিত ব্যক্তিরা শ্...

Akash 26 Apr, 2026 34
Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)
রেডিও স্পেসিয়াল

Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফির...

Akash 26 Apr, 2026 35