উপন্যাস ও বই

পদ্মজা-পর্ব ০৮

পদ্মজা-পর্ব ০৮

ভোর, বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। সেই সঙ্গে সুন্দর ঠান্ডা একটা হাওয়া বইছে। বৃষ্টি পড়ার কারণে আকাশ মেঘলা, চারপাশটা একটু অন্ধকারাচ্ছন্ন। হালকা আলোতেই মেঝেতে শীতল পাটি বিছিয়ে তিন বোন পড়ছে। ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়েছে রাতভর, বর্ষা-স্নানে প্রকৃতি স্নিগ্ধ। এমন সকালে কেউ কেউ ঘুমাতে চায়, আর কেউ-বা বই পড়তে পছন্দ করে…অথবা পছন্দের অন্য যেকোনো কাজ করে। পূর্ণার ঘুমাতে ইচ্ছে করছে, পড়া একদমই সহ্য হচ্ছে না। পদ্মজাকে বলল, ‘আর কতক্ষণ? ঘুমাতে চাই আপা।’


পদ্মজা নিচু গলায় বলল, ‘এইটুকু শেষ করে ঘুমিয়ে পড়িস।’


‘আম্মা তো আরো পড়তে বলল।’


‘কিছু হবে না। এই যে…’ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘এইটুকু পড় ভালো করে, তাহলেই আম্মা ছুটি দিবে।’


পূর্ণা মনের বিরুদ্ধে গিয়েই পড়া শেষ করল। হেমলতা প্রথমে ছুটি দিতে না চাইলেও পদ্মজার অনুরোধে ছেড়ে দিলেন। ছুটি পেয়ে দৌড়ে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল পূর্ণা, সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে।


কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে রোদ উঠল। স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে পূর্ণাকে অনেক ডাকল পদ্মজা, সাড়া পেল না। এদিকে স্কুলে যাওয়ার সময় হয়েছে। হেমলতা বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘পূর্ণা ঘুমে?’


‘জি, আম্মা।’


‘সে জানে না স্কুল আছে? তবুও কোন আক্কেলে ঘুমাল?’


মায়ের রাগের ফলাফল ভেবে পদ্মজা শঙ্কিত। আজ পূর্ণা নির্ঘাত মার খাবে। সে হেমলতাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘তুমি যাও আম্মা। পূর্ণা কিছুক্ষণের মধ্যে তৈরি হয়ে যাবে।’


হেমলতা জানেন, পূর্ণা এত সহজে ঘুম থেকে উঠবে না। প্রায়ই এমন হয়। যতই আদর করে ডাকা হোক না কেন, বৃষ্টিমাখা সকালে তার ঘুম ভাঙানো যুদ্ধের সমান। বাঁশের কঞ্চিকে পূর্ণা ভীষণ ভয় পায়, অথচ কঞ্চির বাড়ি না খাওয়া অবধি ঘুম তাকে কিছুতেই ছাড়ে না! এ যেন ভূত তাড়ানো। হেমলতা বাঁশের কঞ্চি আনতে বাঁশ বাগানের দিকে চলে যান। এদিকে পদ্মজা ডেকেই যাচ্ছে, ‘পূর্ণা? ওঠ। মারটা খাওয়ার আগে ওঠ। এই পূর্ণা। পূর্ণা রে…পূর্ণা, উঠ।’


পূর্ণা পিটপিট করে চোখ খুলে আবার ঘুমিয়ে যাচ্ছে। প্রেমা এই ব্যাপারটা খুব উপভোগ করে। একটা মানুষ এত ডাকাডাকির পরও কী করে ঘুমিয়ে থাকতে পারে? সে নিষ্কম্প স্থির চোখে তাকিয়ে আছে বড়ো দুই বোনের দিকে। হেমলতা হাতে বাঁশের কঞ্চি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তা দেখে পদ্মজা পূর্ণাকে জোরে চিমটি কাটে, কিন্তু মুখে বিরক্তিকর আওয়াজ তুলে আবার ঘুমে তলিয়ে যায় পূর্ণা।


তুই সর পদ্ম। ও মারের যোগ্য। পিটিয়ে ওর ঘুম ছুটাতে হবে, হেমলতার রাগান্বিত স্বর।


পদ্মজা মায়ের কথার ওপর কিছু বলার সাহস পেল না, দূরে গিয়ে দাঁড়াল। হেমলতা পূর্ণার পায়ের গোড়ালিতে কঞ্চি দিয়ে বাড়ি দিতেই একটা আওয়াজ হলো প্যাঁচ করে। ভয়ে চোখ বুজে ফেলল পদ্মজা। ইস! পায়ের চামড়া ছিঁড়ে গেছে বোধহয়। ঘুমন্ত পূর্ণার মস্তিষ্ক জানান দেয়, আম্মা এসেছেন এবং তিনি আঘাত করছেন। সে চোখ খোলার আগেই দ্রুত উঠে বসল। চোখ খুলতে খুলতে যদি দেরি হয়ে যায়! বোকাসোকা মুখ করে মায়ের দিকে তাকাল পরিস্থিতি বুঝতে। পদ্মজা ঠোঁট টিপে হাসছে, প্রেমা জোরে হেসে উঠল। হেমলতা কড়া চোখে তাকাতেই থেমে গেল দুই বোনের হাসি। পূর্ণা ভীতু কণ্ঠে বলল, ‘আর হবে না আম্মা।’


‘সে তো প্রতিদিনই বলিস।’


‘আজই শেষ। আম্মা…আম্মা মেরো না।’ সে লাফিয়ে উঠে চৌকির কোণে গিয়ে বসে।


এমন সময় ঘন মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল, শোনা গেল বজ্রপাতের আওয়াজ। মনে মনে পূর্ণা-প্রেমা খুশি হলো। আজ আর স্কুলে যেতে হবে না। বাড়ি থেকে দুই ক্রোশ দূরে স্কুল। আম্মা নিশ্চয় যেতে না করবেন। পূৰ্ণা খুশি লুকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘মেঘ আসবে মনে হয়। যাব স্কুলে?’


‘মেঘ তোর কী সমস্যা করল? এখনি যাবি স্কুলে। তৈরি হ।


হেমলতা চলে যেতেই পূর্ণা ভ্রুকুঞ্চন করে থম মেরে বসে রইল।


পদ্মজা তাড়া দেয়, ‘বসে আছিস কেন? জলদি কর। নয়তো আবার মার খাবি।’


পূর্ণা তীব্র বিরক্তি নিয়ে স্কুলের জন্য প্রস্তুত হয়।


বর্ষাকাল চলছে। রাতে বিরতিহীনভাবে বৃষ্টি হওয়ায়, কাদা জমেছে রাস্তায়। পথ চলা কষ্টকর।


তিন বোন হাতে জুতা নিয়ে পা টিপে হাঁটছে। তাদের মনে কাজ করছে পিছলে পড়ে বই খাতা নষ্ট হওয়ার ভয়। অর্ধেক পথ যেতে না যেতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। পথের পাশ থেকে বড়ো তিনটে কচু পাতা ছিঁড়ল পদ্মজা। পূর্ণা-প্রেমার হাতে দুটো দিয়ে নিজের মাথায় ধরল তৃতীয়টি, তবে তাতে লাভ হলো না। মাথা না ভিজলেও, শরীর ও বই-খাতা ভিজে একাকার হয়ে গেল।


পূর্ণা বিরক্তি প্রকাশ করল, ‘ধ্যাত! ভিজে স্কুলে গিয়ে লাভ কী আপা? দেখো, হাঁটু অবধি পায়জামা কাদা আর বৃষ্টির পানি দিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।’


পদ্মজা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, ‘বুঝতে পারছি না কী করব! স্কুলে যাব? নাকি বাড়ি ফিরব।’


‘আপা, বাড়ি যাই।’ বলল প্রেমা।


পদ্মজা একটু ভাবল। এরপর দুই বোনকে বলল, ‘ভিজে তো কতবারই গেলাম। আজও যাই। সমস্যা কী?’


অগত্যা স্কুলেই যেতে হলো। পদ্মজা সম্মতি না দিলে বাড়িতে গিয়েও উঠতে পারবে না তারা। স্কুল ছুটির আগেও বৃষ্টি পুরোপুরি থামেনি। তখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই বাড়ি ফেরার পথ ধরল দুই বোন। প্রেমার এক ঘণ্টা আগে ছুটি হয়েছে। পদ্মজা নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘স্কুলে আব্বা এসেছিলেন?’


‘হুম। প্রেমাকে নিয়ে গেছে।’


‘তোর সঙ্গেও তো দেখা হলো।’


পদ্মজার গলাটা করুণ শোনায়। পূর্ণার মন খারাপ হয়। আব্বা কেন তার এত ভালো আপাকে ভালোবাসে না?


বৃষ্টির পানি ও মাটি মিশে কাদায় একাকার হয়ে গেছে পুরো পথ। কাদামাটিতে হাঁটার মতো ভোগান্তি আর নেই। পূর্ণা যেভাবে হেলেদুলে হাঁটছে তাতে পদ্মজার ভয় হচ্ছে, পড়ে না যায়। সে বোনকে ডেকে বলল, ‘পূর্ণা, সাবধানে হাঁট। পড়ে যাবি।’


তার সাবধানী বাণী শেষ হতেই ধপাস করে কাদামাটিতে পড়ে গেল পূর্ণা। আঁতকে উঠে পদ্মজা। পূর্ণার পা নিমিষে ব্যথায় টনটন করে ওঠে। পদ্মজা দুই হাতে আঁকড়ে তোলার চেষ্টা করে। পূর্ণা কিছুতেই ওঠাতে পারছে না। পা যেন ব্যথায় অবশ হয়ে গেল।


কাঁদো কাঁদো হয়ে পদ্মজাকে বলল, ‘আপা, পা ভেঙে গেল মনে হয়। ইস…এত ব্যথা করছে!’


‘মচকেছে বোধহয়। ঠিক হয়ে যাবে। ওঠার চেষ্টা কর। আমার গলা ধরে ওঠ।


গ্রামের পথ, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে বলে পথে কেউ নেই। গৃহস্থরা ভাতঘুম দিয়েছে। সামনের বিলে থইথই জল, তার পাশে খেত; ডানে-বাঁয়ে কাদামাটির পথ, পেছনে ঝোপঝাড়। পদ্মজা সাহায্য করার মতো আশপাশে কাউকে দেখতে পেল না। এদিকে পা সোজা করার শক্তি পাচ্ছে না পূৰ্ণা, প্রচণ্ড ব্যথা! ঠোঁট কামড়ে কাঁদছে সে। পদ্মজা না পারছে পূর্ণাকে তুলতে, আর না পারছে পূর্ণার কান্না সহ্য করতে। সে মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, ‘আল্লাহ, কিছু করো। সাহায্য করো।’ একটু পর পূর্ণাকে বলল, ‘বোন আমার, একটু চেষ্টা কর উঠতে।’


পদ্মজার উৎসাহে পূর্ণা পায়ের পাতা মাটিতে ফেলল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ব্যথার বিজলি চমকে ওঠল তার পুরো শরীরে। ‘ও মা! আপা রে, পারছি না। আমার পা শেষ। মরে যাব আমি।’


‘এসব বলিস না। পায়ের ব্যথায় কেউ মরে!’


অল্পক্ষণের মাঝেই আহত পা ফুলে দুই ইঞ্চি উঁচু হয়ে গেছে! তা দেখে আতঙ্কে চোখ-মুখ নীল হয়ে গেল পদ্মজার, কান্না পাচ্ছে তার। পদ্মজা আলতো করে চাপ দিতেই পায়ের ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল পূর্ণা।


‘একটু সাবধানে হাঁটলে কী হতো? ইশ, এখন কী কষ্টটা হচ্ছে।’ পদ্মজার চোখ জলে ভরে উঠেছে।


‘আপা…আপা, ব্যথায় মরে যাচ্ছি।’


পদ্মজা খুব কাছে পায়ের শব্দ পেল। চকিতে চোখ তুলে তাকাল সে খেতের দিকে; পরমুহূর্তে হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে। সে উচ্ছ্বাসে চেঁচিয়ে উঠল, ‘পূর্ণা রে, আম্মা আসছে!’


হেমলতাকে দেখে পূর্ণা কলিজায় পানি প্রায়, মাকে দেখেই যেন ব্যথা অনেকটা কমে গেছে। হেমলতা ছুটে আসেন। পূর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘কিছু হয়নি। এসব সামান্য ব্যাপার।


এরপর পদ্মজাকে বললেন, ‘তুই বইগুলো নে।’


হেমলতা এদিকে সেলাই করা কাপড় দিতে এসেছিলেন। যার কাপড় ছিল, সে অসুস্থ। তাই যেতে পারছিল না। বাড়িতেও কোনো কাজে মন টিকছিল না। তাই ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। ঘরে চুপচাপ বসে থাকার চেয়ে একটা মানুষকে সাহায্য করা ভালো। ফেরার পথে তিনি দূর থেকে দুটো বিপর্যস্ত মেয়েকে দেখতে পেলেন। একটা মেয়ে পথে বসে আছে, আরেকটা মেয়ে তাকে তোলার চেষ্টা করছে। মেয়ে দুটিকে চিনতে পেরে বুক কেঁপে ওঠে তার। পথ দিয়ে আসলে দেরি হবে বলে তিনি খেতের ভেতর দিয়েই ছুটে এসেছেন।


পূর্ণা ব্যথায় যেন নিশ্বাস নেয়ার শক্তি পাচ্ছে না। একটা ভ্যান পাওয়া গেলে খুব উপকার হতো। আশ্চর্যভাবে দুই মিনিটের মাথায় দেখা মিলল ভ্যানের! ভ্যানে চিত্রা, লিখনসহ আরো দুজন, তারা মাতব্বর বাড়িতে গিয়েছিল। আরেকটু এগোতেই পদ্মজা আর তার মা-বোনকে দেখতে পেল চিত্রা, উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ভ্যানচালককে বলল, ‘চাচা, ভ্যান থামান।’


চিত্রার দৃষ্টি অনুসরণ করে লিখনের নজরে ব্যাপারটা আসতেই সে তাড়াহুড়ো করে ভ্যান থেকে নেমে আসে, চিত্রাও বসে নেই। চোখে-মুখে ভয় নিয়ে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে? পূর্ণার কী হয়েছে?


পদ্মজা বলল, ‘কাদায় পড়ে পা মচকে গেছে।’


হেমলতা, চিত্রা, পদ্মজা এবং পূর্ণাকে ভ্যানে তুলে দিয়ে লিখনসহ বাকি দুজন সহকর্মী ভ্যান ছেড়ে দিল। তারা মোড়ল বাড়িতে হেঁটেই ফিরবে।


.


অনেকটা কমেছে পা ব্যথা, দুটি বালিশের ওপর রাখা হয়েছে পা। ব্রেস নেই বলে ব্রেসের মতো কাপড় বেঁধে দিয়েছেন হেমলতা। যে ব্যথা পেয়েছে, তাতে কয়দিন স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতেও পারবে না। হেমলতা মেয়েকে খাইয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘এবার খুশি? স্কুলে যেতে হবে না। কাজ করতে হবে না। সকালে উঠে পড়তে বসতে হবে না।


পূর্ণা রাজ্যের দুঃখ নিয়ে বলল, ‘সবই ঠিক আছে। কিন্তু এখন টিভি দেখতে যাব কীভাবে?’


সাড়া না পেয়ে পূর্ণা বুঝতে পারল, সে মুখ ফসকে ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছে। বিব্রত হয়ে উঠল ও, ঢোক গিলল। এরপর কাঁচুমাচু হয়ে মিইয়ে যাওয়া গলায় বলল, ‘মোটেও খুশি হইনি।’


পূর্ণার অগোচরে হেমলতা ঠোঁট চেপে হাসেন। আড়াল থেকে তা দেখে পদ্মজাও হাসল।


তখন দিনের শেষভাগ। সূর্য মামা আকাশ গাঢ় লাল আভায় রাঙিয়ে বিদায় নিতে চলেছেন। আকাশের সঙ্গে মিশে রয়েছে ঘন মেঘ, সেই মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে দিনান্তের শেষ আলো। ঠিক তখন মগা এসে জানাল, মুন্নার বাপ খুন হয়েছে। কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সবার মাথায় যেন আছড়ে পড়ল বজ্র। পঙ্গু, ভিক্ষুক অসহায় মানুষটাকে আবার কে মারল? এমন মানুষের শত্রু থাকে? তাও আবার এমনই যে একেবারে মেরে ফেলল! হেমলতা শ্বাসরুদ্ধকর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘কখনকার ঘটনা?’


মগা জানাল, দুপুরের কথা। দুপুর দুটো কি তিনটায় গ্রামবাসী জানতে পারে ঘটনাটি। আস্তে আস্তে সব গ্রামে খবর যাচ্ছে। লাশ নোয়াপাড়ার ধানখেতে পাওয়া গেছে। সবাই মিলে মুন্নার বাপকে দেখতে যায়। বাড়িতে রয়ে যায় শুধু পদ্মজা, প্রেমা ও পূর্ণা।


পুলিশ লাশ নিয়ে যাওয়ার পর সবাই মুন্নাকে নিয়ে বিপাকে পড়ে। আত্মীয় বলতে তার কেউ নেই। দুঃসম্পর্কের যারা আছে তারা মুন্নার দায়িত্ব নিতে চাইল না। মাতব্বর মুন্নার ভার নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুন্না জানাল, সে থাকলে পদ্মজাদের বাড়িতে থাকবে। হেমলতা মাতব্বরের অনুমতি নিয়ে সানন্দে মুন্নাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। এখন থেকে মুন্না এই বাড়ির ছেলে। পদ্মজা-পূর্ণা খুব খুশি হয়। খুশি হলো না শুধু প্রেমা। মুন্না ও প্রেমা সমবয়সি। প্রেমা ভাবছে, তার আদর এখন ভাগাভাগি হয়ে যাবে।


হেমলতা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে পদ্মজাকে বললেন, ‘প্রেমার বোধহয় মুন্নাকে পছন্দ হচ্ছে না। দুজনের মধ্যে সখ্যতা করে দিস, যাতে একজন আরেকজনকে আপন চোখে দেখে।’


পদ্মজা আশ্বস্ত করে বলল, ‘কয়দিন গেলেই মিশবে


মুন্না বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। হেমলতা তাকে ঘরে এনেই গরম গরম ভাত খাইয়ে দিয়েছিলেন। খেয়েই ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ে। রাত তো কম হলো না! মা-বোনের বৈঠক দেখে পূর্ণা বলল, ‘আম্মা, মুন্নার নতুন নাম রাখা উচিত।’


‘কেন?’


‘এখন থেকে মুন্না আমাদের ভাই। আমাদের নাম প দিয়ে। তাইলে ওর নাম-ও প দিয়ে হবে। তাই না আপা?’


হেমলতা হেসে বললেন, ‘তুই নাম রাখ তাহলে।’


‘রেখেছি তো। প্রান্ত মোড়ল।’


‘মুন্নাকে আগে ওর নতুন নাম সম্পর্কে জানা, যদি রাজি হয় তখন সবাই এই নামে ডাকব। ওরও তো পছন্দ আছে।’


‘রাজি হবে না মানে? পিটিয়ে রাজি করাব


মেয়ের কথায় হেমলতা হাসলেন। পূর্ণা বলল, শ্বশুরবাড়ি থেকে গিয়ে আনার মতো একটা ভাই হলো আমাদের। আপাকে যখন বিয়ে দেব, আমি আর প্রান্ত গিয়ে আপাকে নিয়ে আসব তাই না আম্মা?’


অসুস্থ হলে খুব কথা বলে পূর্ণা। মুখ বন্ধ রাখতেই পারে না। অনেক বছর আগের ঘটনা, বা কয়েক বছর পর কী হবে তা নিয়ে অনবরত কথা বলতে থাকে।


.


গহিন অন্ধকার। আজ বোধহয় অমাবস্যা। হেমলতা কালো চাদরের আবরণে ঘাপটি মেরে বারান্দায় বসে আছেন। হাতের কাছে ছুরি, লাঠি। গত তিন দিন ধরে ঘরের পাশে পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তখন ঘরে মোর্শেদ ছিলেন, আর যাই হোক—পুরুষ তো, তাই সাহসও ছিল বুকে। আজ মোর্শেদ নেই। মুন্নাকে দত্তক নিয়ে বাড়িতে আনায় তিনি ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়েছেন। কবে ফিরবেন ঠিক নেই! আজ কিছুতেই ঘুমানো যাবে না। হাতেনাতে সন্দেহকারীকে ধরে এই বিপদ থেকে মুক্ত হতে হবে। কিন্তু অনেকক্ষণ হলো কেউ আসছে না। চোখ বুজে আসছে হেমলতার। সারাদিন অনেক খাটুনি গেল।


কাদামাটিতে ছপছপ শব্দ তুলে কেউ আসছে। হেমলতা সতর্ক হয়ে ওঠেন, শক্ত করে ধরলেন লাঠি-ছুরি। পায়ের শব্দটা কাছে আসতেই তিনি বেরিয়ে আসেন। অন্ধকারে মুখ পরিষ্কার নয়। আন্দাজে ছুঁড়ে মারেন হাতের লাঠি। লাঠিটা বেশ ভালোভাবেই পড়ল সামনে থাকা ছায়াটির ওপর, হতভাগা আর্তনাদ করে বসে পড়ল মাটিতে; ততক্ষণে পেছনের ছায়াটি দৌড়ে পালাল! প্রথমজনও পালানোর চেষ্টা করল, হেমলতার জন্য পেরে উঠল না। তিনি আরেকটা লাঠি দিয়ে আবার আঘাত করে বসেন, তার দৃষ্টি থেকে যেন আগুন স্ফুরিত হচ্ছে।


আহত ব্যক্তির আর্তচিৎকার শুনে বাড়ির ভেতর থেকে ছুটে আসে সবাই। টর্চের আলোতে চারদিক আলোকিত হয়ে ওঠে। হেমলতা স্বাভাবিক ভঙ্গি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি যেন জানতেন এই ছায়াটিরই আসার কথা ছিল। আজই শুটিং দলকে বাড়ি থেকে বের করবেন। তবেই শান্তি! হই- হুল্লোড় শুনে পদ্মজা, প্রেমা, মুন্না বেরিয়ে আসে। পূর্ণা ঘরেই রইল।


চোখের সামনে ডিরেক্টর আবুল জাহেদকে দেখে চমকে গেল পদ্মজা!


আর ঠিক তখনই কোত্থেকে যেন আগমন ঘটল মোর্শেদের!

কমেন্ট

0

এখনো কোনো কমেন্ট নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১৫৫৫ - জার্...

Akash 26 Apr, 2026 35
Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফিরেছে নতুন আ...

Akash 26 Apr, 2026 35
আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল
প্রাত্যাহিক আয়োজন

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১...

Akash 26 Apr, 2026 35
আজকের রাশিফল: ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রাত্যাহিক আয়োজন

আজকের রাশিফল: ২৬ এপ্রিল ২০২৬

মেষ রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। এই রাশির বিবাহিত ব্যক্তিরা শ্...

Akash 26 Apr, 2026 34
Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)
রেডিও স্পেসিয়াল

Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফির...

Akash 26 Apr, 2026 35