উপন্যাস ও বই

পদ্মজা-পর্ব ৫০

পদ্মজা-পর্ব ৫০

পড়ন্ত বিকেলের শীতল বাতাসে শরীর কাঁটা দিচ্ছে। পদ্মজা শাল গায়ে জড়িয়ে নিয়ে পা রাখল নিচতলায়, ফরিনার ঘরে। ফরিনা কাঁথা সেলাই করছিলেন। পদ্মজাকে দেখে দুই পা ভাঁজ করে বসে উল্লাস করে বললেন, ‘তুমি আইছো!


পদ্মজা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘জি, আম্মা। কাঁথা সেলাই করছিলেন নাকি। আমি সাহায্য করি?’


‘না, না তুমি এইসব পারবা না। সুঁই লাগব হাতে।’


‘কিছু হবে না, আম্মা। প্রতিদিনই সেলাই করা হয়।’


ফরিনা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘তুমি কাঁথা সিলাও?’


পদ্মজা হেসে বলল, ‘ওই একটু।’


‘কেরে? আমরা থাকতে তুমি সিলাও কেরে? তোমার সৎ আম্মায় তো নকশিকাঁথা সিলায়। হে থাকতে তোমার সিলাই করা লাগে কেরে?’


পদ্মজা ফরিনার হাত থেকে সুঁই টেনে নিয়ে বলল, ‘আব্বা মারা যাওয়ার পর দুই বছর আমি কেমন অবস্থা ছিলাম জানেনই তো। সে অবস্থায় আমার পক্ষে আমার পরিবারের জন্য কিছু করা সম্ভব ছিল না। তখন উনি পর হয়েও, সৎ মা হয়েও নিজের ঘাড়ে সব দায়িত্ব তুলে নিলেন। কিন্তু যতটুকু করতেন ততটুকুতে পরিবার চলতে গিয়ে হিমশিম খেত। তাই আমিও চেষ্টা করেছি একটু যদি নকশিকাঁথার পরিমাণটা বাড়ানো যায়!’ পদ্মজার ফুলের পাপড়ির মতো ফোলা ফোলা দুটি ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল, সেই হাসিতে পরমা সুন্দরীর মুখমণ্ডল যেন আলোকিত হয়ে উঠল অল্প আভায়। ফরিনা অবাক হয়ে সেই হাসি দেখলেন।


মন দিয়ে কাঁথায় ফুল তুলছে পদ্মজা। দাঁত দিয়ে সুতা কেটে ফরিনার দিকে তাকাল। পদ্মজার নিখুঁত নাক, নিখুঁত চোখ। ফরিনা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। পদ্মজা ডাকল, ‘আম্মা?’


ফরিনার সংবিৎ ফিরতেই প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি নাকি শহরে কাম করো?


পদ্মজা হাসল, ‘হু, করা হয়। প্রেমা-প্রান্ত দুইজনই পড়াশোনা করে। পড়ালেখার কত খরচ! আর পূর্ণা তো পড়ালেখার চেয়ে বেশি খরচ করে ফেলে শাড়ি-অলংকার কিনতে গিয়ে। আম্মা নেই। বাধা দিতে কষ্ট হয়। আর উনি নিজের সব সঞ্চয় উজার করে দেন আমার তিন ভাই-বোনকে। টাকা তো থাকে না। তাই চাকরি নিতে হলো। দুই বোনের বিয়ে দিতে হবে না? আমার তো ফরজ কাজ বাকি। তার জন্য টাকা জমাতে হচ্ছে। আর উনার নকশিকাঁথার টাকার সঙ্গে বেতনের কিছুটা অংশ মিলিয়ে পাঠিয়ে দেই। বেশ ভালোই চলছে। উনি আছেন বলেই আমার মাথার উপরের চাপটা কমেছে।’


‘হ, বাসন্তী অনেক ভালা। আমি হের চেয়ে চার বছরের বড়ো। মেলা সম্মান করে আমারে। আচ্ছা, আমির তোমারে বাইরে কাম করতে দিছে?’


এ প্রশ্নে পদ্মজা কপাল চাপড়ে বলল, ‘আর বলবেন না, আম্মা! কী যে যুদ্ধ করতে হয়েছে। শেষমেশ রাজি হয়েছেন। কিন্তু উনার অফিসে নাকি চাকরি করতে হবে। উনার অফিসে চাকরি নিলে উনি আমাকে কোনো কাজ করতে দিতেন? টাকা ঠিকই মাস শেষে হাতে গুঁজে দিতেন। ঘুরে-ফিরে, স্বামীর টাকায় বাপের বাড়ি খায় কথাটা আত্মসম্মানের সঙ্গে লেগে যেত। এ নিয়ে তিনদিন আমাদের ঝগড়া ছিল। আলাদা থেকেছি, কেউ কারো সঙ্গে কথা বলিনি।’


ফরিনা বেশ আগ্রহ পাচ্ছেন। উৎসুক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘এরপরে কী হইলো? কাম করতে দিছে কেমনে?’


‘এরপর… তিন দিন পর এসে বলল, চাকরি পেয়েছে একটা। ছয় ঘণ্টা কাজ। হিসাব রক্ষকের পদ। বেতন ভালো। জানেন আম্মা, আমি ভীষণ অবাক হয়েছি! এত কম সময়ের চাকরি, আবার বেতনও তুলনায় বেশি 1 এরপর জানতে পারি উনার পরিচিত একজনের অফিসে চাকরি বন্দোবস্ত করেছেন। উনি চান না আমি বেশি সময় বাইরে থাকি। আবার জেদ ধরেও বসে ছিলাম। এভাবেই সব ঠিক হয়। ইনশাআল্লাহ আম্মা, পূর্ণার বিয়েটা ধুমধামে হয়ে যাবে। প্রেমার তো দেরি আছে। অনেক পড়বে ও।’


ফরিনা পদ্মজার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘আল্লাহ হাজার বছর বাঁচায়া রাখুক।’


‘আম্মা, রুম্পা ভাবি কী তিন তলায়?’


‘হ।’


‘আজ দেখতে যাব ভাবছি। চাবি কার কাছে?’


ফরিনা মুখ গুমট করে বললেন, ‘হেই ঘরে যাওনের দরকার নাই। রিদওয়ান চাবি দিব না। ওরা আর আমারারে দাম দেয় না। যেমনে ইচ্ছা চলে।’


‘দিবে না মানে কী? আপনি গুরুজন আপনাকে দিতে বাধ্য।’


‘চাইছিলাম একবার, যা ইচ্ছা কইয়া দিছে।’ ফরিনার মুখে আঁধার নেমে আসে। তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, ‘চাবি চাওনের লাইগগা রিদওয়ান হের আম্মারেও মারছে।’


পদ্মজার চোখ দুটি বড়ো বড়ো হয়ে যায়, ‘সে কী! মায়ের গায়ে হাত তুলেছে?


ফরিনা কাঁথা সেলাই করতে করতে বললেন, ‘নিজের মা আর কই থাইকা! এই ছেড়ার মাথা খারাপ। অমানুষ।


‘বাড়ির অন্যরা কিছু বলেনি?’


‘অন্যরা কারা?’


‘আব্বা, চাচা, বড়ো ভাই কেউ কিছু বলেনি?’


‘বাকিদের কথা জানি না। তোমার শ্বশুর তো নিজেই শকুনের বাচ্চা।’ পদ্মজা চমকে তাকাল। ফরিনাও চকিতে চোখ তুলে তাকালেন। তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন। দুজন দুজনের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। পদ্মজা প্রশ্ন করার আগে ফরিনা বললেন, ‘পূর্ণায় গাছে উঠছে। সকালে আছাড়ড়া খাইল বিকেল অইতেই গাছে উইট্টা গেছে। ছেড়িডারে কয়ডা মাইর দিয়ো।’


পদ্মজা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে তার শাশুড়ি আগের কথাটা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। সে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে পারল না। মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘আমি আসি।’


‘যাও।’


পদ্মজা দরজা অবধি এসে ফিরে তাকাল। ফরিনা দ্রুত দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলেন। পদ্মজা ঘর ছাড়তেই তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। পদ্মজা উদাসীন হয়ে হাঁটছে আর ভাবছে: আম্মা কেন নিজের স্বামীকে শকুনের বাচ্চা বললেন?


পদ্মজা সামলে নিলো নিজেকে। এখন এসব ভাবা যাবে না। রিদওয়ানের কাছ থেকে চাবি নিতে হবে। সে রিদওয়ানের ঘরের সামনে এসে দরজায় শব্দ করতেই ওপাশ থেকে পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘কে?’


পদ্মজা জবাব না দিয়ে আরো জোরে শব্দ করল। রিদওয়ান কপাল কুঁচকে দরজা খুলল। পদ্মজাকে দেখে কপালের ভাঁজ মিলিয়ে যায়। ঠোঁটে ফুটে ওঠে হাসি। মোটা হয়েছে আগের চেয়ে। গালভরতি ঘন দাড়ি। এক- দুটো চুল পেকেছে। সে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, ‘আরে বাপরে, পদ্মজা আমার দুয়ারে এসেছে!’


পদ্মজা সোজাসুজি বলল, ‘রুম্পা ভাবির ঘরের চাবি দিন।


রিদওয়ান দরজা ছেড়ে দাঁড়াল, ‘এতদিন পর এসেছো আবার আমার ঘরের সামনে! ভেতরে আসো, বসো। এরপর কথা বলি।’


‘আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে আসিনি। দয়া করে চাবিটা দিন।’


‘চাবি তো দেব না।’


‘কী সমস্যা?’


রিদওয়ান পদ্মজার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আরে, ঘরে আসো তো আগে।’


পদ্মজা এক ঝটকায় রিদওয়ানের হাত সরিয়ে দিল। চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল, ‘চাবি দিন।’


‘চোখ দিয়ে তো আগুন ঝরছে। কিন্তু আমি তো ভয় পাচ্ছি না। চাবি আমি দেব না।’


‘দেবেন না?’


রিদওয়ান আড়মোড়া ভেঙে আয়েশি ভঙ্গিতে বলল, ‘না।’


পদ্মজা আর কথা বাড়াল না। চলে গেল। রিদওয়ান পিছু ডেকেছে। সে শোনেনি। মগাকে দিয়ে পাথর আনিয়ে সোজা চলে গেল তিন তলায়। মদন একটা ঘরের সামনে চেয়ার নিয়ে বসে ছিল। তাহলে এই ঘরেই রুম্পা আছে। সে দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই মদন বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘কুনু কাম আছিল ভাবি?’


পদ্মজা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ‘তালা ভাঙব। মগা, তালা ভাঙ।’


মদন দুই হাত মেলে দরজার সামনে দাঁড়াল, ‘রিদওয়ান ভাইয়ের কাছে চাবি আছে। তার কাছ থাইকা লইয়া আহেন। তালা ভাইঙেন না।’


‘উনি আমাকে চাবি দেননি। তাই আমি তালা ভাঙব। আপনি সরে দাঁড়ান।’


‘না, ভাবি, এইডা হয় না। আমার ওপরে এই ঘরডার ভার দিছে।’


‘আপনি সরে দাঁড়ান।’ পদ্মজা কথাটা বেশ জোরেই বলল। মদন হাওলাদার বাড়ির বউয়ের সামনে আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। দৌড়ে চলে গেল। বাড়ির সবাইকে জানাল, পদ্মজা তালা ভাঙছে।


সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো খলিল, আলমগীর, আমির, রিদওয়ান, ফরিনা, আমিনা। ততক্ষণে পদ্মজা তালা ভেঙে ফেলেছে। আমির হন্তদন্ত হয়ে এসেই প্রশ্ন করল, ‘তালা ভাঙলে কেন?’


‘আপনার ভাই আমাকে চাবি দেয়নি। আমার রুম্পা ভাবির সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে হচ্ছিল তাই ভেঙেছি।’


‘এইডা অসভ্যতা। তোমারে ভালা ভাবছিলাম। ছেড়ি মানুষের এত তেজ, অবাধ্যতা ভালা না।’


পদ্মজা এক নজর খলিলকে দেখল। এরপর ঢুকে গেল রুম্পার ঘরে। রুম্পা ঘরের মাঝে মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। লম্বা চুল এখন ঘাড় অবধি! কে কেটে দিয়েছে? যেন চুল না ময়লা ঝাড়ু। পদ্মজা দৌড়ে রুম্পার পাশে এসে বসে। রুম্পার শাড়ি ঠিক করে দিয়ে ডাকল, ‘ভাবি? ভাবি? শুনছো ভাবি?’


রুম্পার সাড়া নেই। গলায়, হাতে, পায়ে মারের দাগ। ফরিনা তাকে দেখে চমকে গেলেন। রুম্পার এক হাত চেপে ধরে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ও মা গো, কেলায় মারছে বউডারে? আল্লাহ গো, কেমনে মারছে। রক্ত শুকায়া পাথথর হইয়া গেছে। এর লাইগগা আমরারে রুম্পার কাছে আইতে দেও না তোমরা? বউডা তোমরারে কী করছে? পাগল মানুষ।’ ফরিনা বাড়ির পুরুষদের দিকে ঘৃণার চোখে তাকান। তিনি রূম্পার অবস্থা দেখে কাতর হয়ে উঠেছেন।


আমিনা দূরেই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বরাবরই অন্যরকম মানুষ। অহংকারী, হিংসুক। অন্যদের ভালো দেখতে পারে না। রানির জীবনটা এভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আরো বেশি খামখেয়ালি হয়ে উঠেছেন।


পদ্মজা আমিরের দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে উঠল, ‘আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? অন্যরা পাষাণ। আপনি তো পাষাণ না। ভাবিকে বিছানায় তুলে দিন।’


পদ্মজার কথায় আমির রুম্পাকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল। আমির আর ফরিনা ছাড়া বাকি সবাই বিরক্তিতে কপাল ভাঁজ করে চলে যায়। তারা অসন্তুষ্ট। খলিল যাওয়ার আগে বিড়বিড় করে পদ্মজাকে অনেক কিছু বললেন। পদ্মজা সেসব কানে নেয়নি। সে শুধু অবাক হচ্ছে। মানুষগুলোর প্রতি ঘৃণা হয়। সে রুম্পার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে। আমিরকে বলে, কবিরাজ নিয়ে আসতে। আমির চলে যায়। ফরিনার কাছ থেকে পদ্মজা জানতে পারল, তিনি দুই বছর পর রুম্পাকে দেখছেন! কী অবাক কাণ্ড! কখন চুল কাটা হয়েছে জানেন না। পদ্মজা জানতে চাইল, ‘কেন এত ভয় পান বাড়ির পুরুষদের? একটু শক্ত করে কথা বলে ভাবিকে দেখতে আসতে পারলেন না? ভাবির মা বাপের বাড়ি কোথায়? উনারা মেয়ের খোঁজ নেন না?’


‘রুম্পার মা-বাপ নাই। ভাই আছে দুইডা। ভাইগুলা আগেই খোঁজ নিত না। পাগল হুনার পর থাইকা নামও নেয় নাই।’


‘মানুষ এত স্বার্থপর কী করে হয়, আম্মা?’


ফরিনা রুম্পার শাড়ির ময়লা ঝেড়ে দেন। ঘরদোর পরিষ্কার করেন। রুম্পার জ্ঞান ফেরে ঘণ্টাখানেক পর। কিন্তু কথা বলার শক্তিটুকুও নেই তার। সে ড্যাবড্যাব করে পদ্মজার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন পদ্মজার জন্য অপেক্ষায় ছিল। পদ্মজার জন্যই বেঁচে আছে! কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। কতদিন ধরে তাকে পানি ছাড়া কিছু দেওয়া হচ্ছে না। ঘরের এক কোণে বালির বস্তা রাখা, ক্ষুধার চোটে কতবার বালি খেয়েছে। পেট খারাপ হয়ে পুরো ঘর নষ্ট করেছে। বমি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গতকাল থেকে সে অজ্ঞান। তবুও কেউ এসে দেখেনি। পদ্মজার চোখের জল আপনাআপনি পড়ছে। রুম্পার কষ্ট তাকে দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে। সে মনে মনে শপথ করে, রুম্পাকে নিয়ে শহরে যাবে। ফরিনা ও পদ্মজা মিলে রুম্পাকে গোসল করাল। নতুন শাড়ি পরিয়ে, গরম গরম ভাত খাওয়াল। চুলে তেল দিয়ে দিল। খাওয়া শেষে রুম্পা বিছানায় নেতিয়ে পড়ে। শরীরের শক্তি আসতে সময় লাগবে। একটু ঘুমালেই পুনরুদ্ধার হবে গায়ের জোরের। পদ্মজা রুম্পার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘ঘুমাও, ভাবি।’


পদ্মজা টের পেল, রুম্পার দুর্বল দুটি হাত পদ্মজার হাত শক্ত করে ধরতে চাইছে। সে রুম্পার দুই হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।


রুম্পার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। পদ্মজা জল মুছে দিল। ফরিনাকে বলল, ‘আম্মা, আমি আমার ঘর থেকে আমার কোরআন শরীফ আর জায়নামাজ নিয়ে আসি। আর উনাকে বলে আসি আপাতত আমি রুম্পা ভাবির সঙ্গে থাকব।’


যাও তুমি। আমি এইহানে আছি।’


পদ্মজা বেরিয়ে গেল। বারান্দা পেরোবার সময় উঠানে চোখে পড়ে। সেখানে পূর্ণা, রানি, বাচ্চাদের নিয়ে গোল্লাছুট খেলছে। পূর্ণার পরনে শাড়ি! মেয়েটা এত দস্যি হলো কী করে? সে চোখ সরিয়ে নিজের ঘরের দিকে গেল। সন্ধ্যার আজান পড়ার বেশি দেরি নেই।


রানি এক দলের নেতা, পূর্ণা অন্য দলের নেতা। দুই দলের নাম শাপলা আর গোলাপ। প্রতি দলে ছয়জন করে। বাচ্চাগুলোর বয়স নয়-দশ।


আলো আলগ ঘরের বারান্দায় চেয়ারে বসে আছে। মৃদুল আলগ ঘর থেকে বেরিয়ে বলল, ‘এই বাচ্চারা আমিও খেলতাম।’


রানি বলল, ‘না, না। তোরে নিতাম না।’


পূর্ণা মৃদুলকে দেখেই অন্যদিকে চাইল। তার ভীষণ লজ্জা করছে মৃদুলের সামনে পড়তে! মৃদুল আরেকটু এগিয়ে এসে বলল, ‘ডরাইতাছোস? ডরানিরই কথা। এই মৃদুলের সঙ্গে কেউ পারে না। আর তুই তো মুটকি। কেমনে পারবি?’


‘আমি তোর চার মাসের বড়ো। সম্মান দিয়া কথা ক। মাঝখান থাইকা সর। খেলতে দে।’


‘ধুর, তোর ছেড়ির এখন খেলার সময়। আর তুই খেলতাছস। সর। এই এই, বোয়াল মাছ। তোমার দলের একটারে বাদ দিয়া আমারে লও। এই মুটকিরে একশোটা গোল্লা না দিলে আমি বাপের ব্যাঠা না।’


পূর্ণা হাঁ করে তাকাল। তাকে বোয়াল মাছ ডাকা হচ্ছে! তার দিকে তাকিয়ে বাচ্চারাও হাসছে! দেখতে চকচকে সুন্দর হয়ে গেছে বলে কী যা ইচ্ছে ডাকার অধিকার বাঘিনী পূর্ণা দিয়ে দিবে? কখনো না। সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল, ‘আমাকে আপনার কোন দিক দিয়ে বোয়াল মাছ মনে হচ্ছে?’


পূর্ণাকে কথা বলতে দেখে মৃদুল হাসল। রসিকতা করে বলল, ‘আরে কালি বেয়াইন দেখি কথা কইতেও পারে।’


পূর্ণা আহত হলো। এক হাতে নিজের গাল ছুঁয়ে ভাবল, আমি কি কালি ডাকার মতো কালো? বাঘিনী রূপটা মুহূর্তে নিভে গেল। তার চোখ দুটি ছলছল করে ওঠে। যাকে পছন্দ করল সে-ই কালি বলছে। পূর্ণা থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। রানি বলল, ‘মৃদুইলল্যা সর কইতাছি। খেলতে দে।’


‘আমিও খেলাম। এই আন্ডা তুই বাদ। তোর বদলে আমি বেয়াইনের দলের হয়ে খেলাম।’


মৃদুলের এক কথায় ন্যাড়া মাথার ছেলেটি সরে দাঁড়াল। মৃদুল খেলার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। পূর্ণাকে বলল, ‘কালি বেয়াইন তুমি আগে যাইবা? নাকি আমি আগে যামু?’


পূর্ণা মিনমিনিয়ে বলল, ‘আমি খেলব না।’


রানি দূর থেকে বলল, ‘দেখছস মৃদুইললা তুই খেলার মাঝে ঢুকছস বইললা পূর্ণা খেলত না। সবসময় কেন খেলা নষ্ট কইরা দেস তুই?’


মৃদুল সেসব কথায় ভ্রুক্ষেপও করল না। সে রসিকতার স্বরেই বলল, ‘আরে বেয়াইনের শক্তি ফুরায়া গেছে। আর খেলতে পারব না। এই আন্ডা তুই আয়। বেয়াইন খেলব না। তুই আইজ হারবিরে আপা।’


রানি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘আমার দলই জিতব।’


‘আগে আগে চাপা মারিস না। আমার মতো দেখায়া দে। এই পেটওয়ালা তুই আগে যা।’


পূর্ণা ব্যথিত মন নিয়ে আলগ ঘর পেরিয়ে অন্দরমহলের দিকে পা রাখে। সে কালো নিজেও জানে! কিন্তু কেউ কালি বললে তার খুব খারাপ লাগে। আল্লাহ কেন তাকে সৌন্দর্য দিলেন না? একটু ফরসা করে দিলে কী হতো? তার আপার মতো কালো রঙে সবাই সৌন্দর্য কেন খুঁজে পায় না? পূৰ্ণা দুই হাত দিয়ে দুই চোখের জল মুছে। অভিমানী মন থেমে থেমে কাঁদছে। এই শাড়ি তো মৃদুলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই পরেছিল। দরকার নেই এই চকচকে পুরুষ।


কেউ তাকে কালি বললে সে ভীষণ রাগ করে! ভীষণ।

কমেন্ট

1
sajedul islam · 28 Mar 2026

good post

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১৫৫৫ - জার্...

Akash 26 Apr, 2026 35
Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফিরেছে নতুন আ...

Akash 26 Apr, 2026 36
আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল
প্রাত্যাহিক আয়োজন

আজকের এই দিনে: ২৬ এপ্রিল

ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১...

Akash 26 Apr, 2026 35
আজকের রাশিফল: ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রাত্যাহিক আয়োজন

আজকের রাশিফল: ২৬ এপ্রিল ২০২৬

মেষ রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। এই রাশির বিবাহিত ব্যক্তিরা শ্...

Akash 26 Apr, 2026 34
Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)
রেডিও স্পেসিয়াল

Bhoot.Com Episode 325 (24 April 2026)

Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফির...

Akash 26 Apr, 2026 36